বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​হাসান শিরাজি

প্রকাশ: ১৮:৩৫, ১০ জুন ২০২৬

২০৩০ সাল

​​​​​​​শেকড় থাকুক দেশের মাটিতে, দক্ষতা ছড়াক বিশ্বজুড়ে

​​​​​​​শেকড় থাকুক দেশের মাটিতে, দক্ষতা ছড়াক বিশ্বজুড়ে

রাকিবের গল্পটা আমাদের খুব চেনা। মফস্বল থেকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে শহরের একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। চার বছর পর যখন একটা চকচকে সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে বের হলো, বাস্তব দুনিয়ায় পা রেখেই সে হোঁচট খেল। বইয়ের পাতায় সে যা পড়েছে, আজকের চাকরির বাজারে তার কোনো দাম নেই।

অন্যদিকে তার আরেক বন্ধু সজীব। সে বৃত্তি নিয়ে বিদেশে পড়তে গিয়েছিল। সজীব এখন একটি গ্লোবাল টেক কো¤‹ানির বড় ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু দেশের কোনো সংকট, সম্ভাবনা বা সমস্যা নিয়ে ভাবার বিন্দুমাত্র সময় বা আগ্রহ তার নেই। শেকড়ের সঙ্গে তার ¤‹র্কটা একেবারেই ছিন্ন।

এই দুটো চিত্রই আমাদের বর্তমান উচ্চশিক্ষার করুণ বাস্তবতা। একদিকে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রস্তুত নয়, অন্যদিকে যারা প্রস্তুত হচ্ছে তারা দেশের মাটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের পৃথিবী হবে ¤‹ূর্ণ ভিন্ন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, অটোমেশন আর জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করে, কিন্তু তাদের মন পড়ে থাকে দেশের মাটিতে। এই ধারণারই নামÑ‘গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডস, লোকাল হার্ট

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই এখনো পুরোনো সিলেবাস আর মুখস্থ বিদ্যার কারখানা হয়ে আছে। পৃথিবী যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ভেতর দিয়ে ছুটছে, আমরা তখনো ক্লাস লেকচার আর খাতা মূল্যায়নের পুরোনো নিয়মে আটকে আছি। ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের তারুণ্যের শক্তির (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে হলে এই স্থবির কাঠামো ভাঙতেই হবে। আমাদের এমন তরুণ প্রজš§ দরকার, যারা সিলিকন ভ্যালির লেটেস্ট প্রযুক্তি বুঝবে, আবার ঠিক সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই হাওর অঞ্চলের কৃষকের ফসলের ক্ষতি কমানোর উপায় বের করবে।

এই পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না। যারা শিক্ষানীতি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তাদের এখনই কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবেÑ

সিলেবাসের শেকল ভাঙুন: বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম কোনো পাথরে খোদাই করা নিয়ম নয় যে বদলানো যাবে না। বাজার সময়ের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে নিয়মিত সিলেবাস আপডেট করার স্বাধীনতা শিক্ষকদের দিতে হবে। মুখস্থবিদ্যার বদলে সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর জোর দিন।

ক্লাসরুমের বাইরে বাস্তব অভিজ্ঞতা: শিক্ষাকে ক্লাসরুমের চার দেয়ালে আটকে রাখলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের কারখানায়, ক্ষেতে-খামারে আইটি ফার্মে পাঠাতে হবে। পড়াশোনার অন্তত একটা বড় অংশ যেন বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আসে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।

গবেষণায় দেশি সমস্যার সমাধান: গবেষণার জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে ঠিকই, কিন্তু সেই গবেষণা হতে হবে দেশের মানুষের সমস্যাকেন্দ্রিক। ঢাকার যানজট কীভাবে কমানো যায়, কিংবা উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত কীভাবে উদ্ভাবন করা যায়Ñএমন সব স্থানীয় সমস্যার আন্তর্জাতিক মানের সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তহবিল দিন।

শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন: শিক্ষকদের যদি শুধু আমলাতান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখা হয়, তবে তারা নতুন কিছু শেখানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাদের গবেষণার স্বাধীনতা দিন, বাইরের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ কাজের সুযোগ করে দিন। শিক্ষক নিয়োগ পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে সবার ওপরে স্থান দিন।

রাকিবের মতো হাজারো তরুণ প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে। তাদের মেধার কোনো অভাব নেই, অভাব শুধু সঠিক দিকনির্দেশনার। ২০৩০ সাল কিন্তু খুব বেশি দূরে নয়।

আমরা যদি আজই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সার্টিফিকেট বিতরণের জায়গা থেকে জ্ঞান উদ্ভাবন তৈরির কেন্দ্রে রূপান্তর করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে আমাদের তরুণরা শুধু দর্শক হয়েই থাকবে।

আমরা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যার তরুণরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা রাখবে, কিন্তু তাদের ƒদয় কাঁদবে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য। শেকড় শক্ত করে মাটিতে আঁকড়ে ধরে তারা ডালপালা ছড়াবে পুরো বিশ্বে। আসুন, সেই লক্ষ্যেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর কাজ আজ থেকেই শুরু করি।