বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​হাসান শিরাজি

প্রকাশ: ১৯:৫৩, ১৩ জুন ২০২৬

কোচিং ব্যবসার ‘কার্টেল’

যখন স্কুল ফাঁকা, কোচিং সেন্টার প্যাকড!

যখন স্কুল ফাঁকা, কোচিং  সেন্টার প্যাকড!

ভোর ৬টা। কুয়াশা বা তীব্র গরমযেকোনো আবহাওয়ার মধ্যেই পিঠে এক মন ওজনের ব্যাগ নিয়ে একটা ১০-১২ বছরের শিশু ছুটছে। পেছনে ছুটছেন তার ক্লান্ত মা। গন্তব্য কোনো নামি স্কুল নয়, গন্তব্য হলো কোনো এককোচিং সেন্টারবাপ্রাইভেট স্যারের ব্যাচ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই যে অন্তহীন দৌড়, এটা আজ আমাদের দেশের প্রতিটি শহরের চেনা ছবি।

যে স্কুলগুলোর দালানকোঠা বানাতে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হলো, যে ক্লাসরুমে মুখরিত থাকার কথা ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের, সেই ক্লাসরুমগুলো আজ দিনে দিনে প্রায় নিষ্প্রাণ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অলিগলির বহুতল ভবনে গড়ে ওঠা এসি রুমের কোচিং সেন্টারগুলো গিজগিজ করছে ছাত্র-ছাত্রীতে। শিক্ষা আজ আর স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে সীমাবদ্ধ নেই; তা চলে গেছে এক শক্তিশালীকোচিং কার্টেলবা ব্যবসায়ী চক্রের পকেটে।

বাস্তবতা হলো, দেশের সিংহভাগ নামি বা অনামি স্কুলের শিক্ষা এখন স্রেফকাগুজেবিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেক স্কুলেই সিলেবাস শেষ করা হয় না, আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনভাবে পড়ানো হয় যা সাধারণ শিক্ষার্থীর মাথার ওপর দিয়ে যায়। অলিখিত নিয়ম দাঁড়িয়ে গেছেযদি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে চাও, তবে স্কুলের বাইরের কোনোবিশেষছাতার নিচে আসতেই হবে।

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এটি এখন আর কোনো সাধারণ টিউশনি বা পার্টটাইম পেশা নয়। এটি একটি সুসংগঠিতকার্টেলবা সিন্ডিকেট। অনেক ক্ষেত্রে স্কুলের শিক্ষকেরাই এর মূল চালিকাশক্তি। নিজের স্কুলের ছাত্রকে নিজের প্রাইভেট ব্যাচে পড়তে বাধ্য করা, না পড়লে প্র্যাক্টিক্যাল বা ক্লাসের পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়ার মতো নীরব মানসিক নির্যাতন এখন ওপেন সিক্রেট। ফলে অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে নিজের রক্ত জল করা টাকা তুলে দিচ্ছেন এই কোচিং মাফিয়াদের হাতে। শিক্ষা যেখানে হওয়া উচিত ছিল বৈষম্য দূর করার হাতিয়ার, এই কোচিং সংস্কৃতি তাকে বানিয়ে দিয়েছে স্রেফ যার টাকা আছে তার জন্যপ্রিমিয়াম প্রোডাক্ট

কোচিং সেন্টারগুলোর এই রমরমা ব্যবসার পেছনে আমাদের সরকারি ঐতিহ্যবাহী স্কুলগুলোর ব্যর্থতাই প্রধান দায়ী। শ্রেণিকক্ষে দায়বদ্ধতার অভাব: শিক্ষকেরা ক্লাসে যতটা না আন্তরিক, তার চেয়ে অনেক বেশি এনার্জি বাঁচিয়ে রাখেন বিকালের প্রাইভেট ব্যাচের জন্য।

মূল্যায়ন ব্যবস্থার ত্রুটি: আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি এমনই যে, এখানে সৃজনশীলতা বা বোঝার চেয়েটেকনিকবাশর্টকাটমুখস্থ করা বেশি কাজে দেয়। আর এই শর্টকাট বিক্রিতেই ওস্তাদ কোচিং সেন্টারগুলো।

সামাজিক মর্যাদা প্রতিযোগিতা: অভিভাবকদের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।আমার ছেলে অমুক নামি স্যারের কাছে পড়ে’—এটি এখন এক ধরনের সামাজিক আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই গড্ডালিকা প্রবাহে চলতে থাকলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে পড়বে। এই সর্বগ্রাসী কোচিং সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা খাতকে বাঁচাতে নীতিনির্ধারকদের এখনই কিছু কঠোর কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে:

শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা: কোনো শিক্ষক যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের বা বাইরের কোনো শিক্ষার্থীকে টাকার বিনিময়ে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন নাএই আইনের কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আইনটি কাগজে-কলমে থাকলেও এর কোনো প্রয়োগ নেই।

স্কুলের জবাবদিহিতা অডিট: শিক্ষকরা ক্লাসে ঠিকমতো সিলেবাস শেষ করছেন কি না, তা তদারকি করার জন্য একটি স্বাধীনশিক্ষা অডিট টিমগঠন করতে হবে। স্কুল পিরিয়ডেই যেন একজন দুর্বল ছাত্রও পড়া বুঝতে পারে, সেই বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।

পরীক্ষা মূল্যায়ন পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন: গাইড বই বা কোচিংয়ের শিট থেকে হুবহু কমন পড়ার যে সংস্কৃতি, তা বন্ধ করতে হবে। পরীক্ষা এমন হতে হবে যা কেবল মুখস্থবিদ্যা দিয়ে পাস করা সম্ভব নয়, ক্লাসের সাধারণ পড়াশোনা দিয়েই যেন উত্তর দেওয়া যায়।

শিক্ষকদের বেতন মর্যাদা বৃদ্ধি: সৎ যোগ্য মানুষদের শিক্ষকতায় ধরে রাখতে হলে প্রাথমিক মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের বেতন এবং সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে, যাতে তারা বাড়তি আয়ের জন্য কোচিংয়ের পেছনে ছুটতে বাধ্য না হন।

স্কুলেই অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা: যেসব শিক্ষার্থী পড়া একটু দেরিতে বোঝে, তাদের জন্য স্কুলের ভেতরেই স্কুল ছুটির পর বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যেরেমিডিয়াল ক্লাসবা অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা সরকার বা স্কুল কর্তৃপক্ষকে করতে হবে।

টাকা যার, শিক্ষাও তারএই নীতি কোনো সভ্য দেশের পরিচয় হতে পারে না। কোচিং সেন্টারের নিয়ন আলো যতই চকচকে হোক, তা কখনোই স্কুলের সবুজ মাঠ, অ্যাসেম্বলির জাতীয় সংগীত আর ক্লাসরুমের বন্ধুদের সঙ্গে যৌথ শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। কোচিং ব্যবসার এই জাঁতাকল থেকে যদি আমরা আমাদের সন্তানদের মুক্ত করতে না পারি, তবে আমরা হয়তো জিপিএ- পাওয়া এক ঝাঁক রোবট পাব, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত সংবেদনশীল মানুষ পাব না। ক্লাসরুমের প্রাণ ফিরিয়ে আনার লড়াইটা তাই আজ শুধু সরকারের একার নয়, এটি আমাদের সবার বাঁচা-মরার লড়াই।