বইয়ের পাতা থেকে স্ক্রিনে
জেন-জি’ প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব ও আমাদের শিক্ষার নতুন রূপরেখা
রাত ১১টা। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছেন শফিক সাহেব। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি উঁকি দিলেন ১৮ বছর বয়সী ছেলে রাফির ঘরে। দেখলেন, রাফির সামনে ল্যাপটপ খোলা, সেখানে ইউটিউবে কোনো একটা সায়েন্সের ভিডিও চলছে ১.৫ গুণ বেশি স্পিডে। তার এক হাতে মোবাইল, যেখানে সে হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করছে, আর কানে হেডফোন দিয়ে গান শুনছে।
শফিক সাহেবের মেজাজটা একটু খারাপই হলো। পড়ার সময় এত দিকে মনোযোগ দিলে পড়াশোনা হয় নাকি? তিনি ধমক দেওয়ার আগেই রাফি ল্যাপটপের স্ক্রিন ঘুরিয়ে বলল, ‘বাবা, দেখো, ফিজিক্সের এই কনসেপ্টটা বইয়ে কী কঠিন করে লেখা! অথচ এই অ্যানিমেটেড ভিডিওটা আর এআই টুলটার সাহায্যে মাত্র ১০ মিনিটে পুরো ব্যাপারটা বুঝে গেলাম।’
শফিক সাহেব অবাক হলেন। তিনি যে যুগে পড়াশোনা করেছেন, সেখানে শিক্ষকের মুখের কথা আর পাঠ্যবই ছিল বেদবাক্য। একটা পড়া না বুঝলে বারবার বই পড়তে হতো, কিংবা পরের দিন স্যারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। আর আজ, তার ছেলের কাছে পুরো পৃথিবীর জ্ঞান হাতের মুঠোয়।
রাফিদের এই প্রজন্মটিকেই সমাজবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘জেনারেশন জেড’ বা সংক্ষেপে ‘জেন-জি’। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যাদের জন্ম, তারাই এই প্রজন্মের। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেই এদের বেড়ে ওঠা। এরা ডিজিটাল নেটিভ। আর এই ডিজিটাল নেটিভদের শেখার ধরন বা ‘লার্নিং স্টাইল’ আগের সব প্রজন্মের চেয়ে একেবারেই আলাদা।
আগের প্রজন্মের কাছে তথ্য পাওয়াটা ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু জেন-জির কাছে তথ্যের কোনো অভাব নেই; বরং তাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো এত এত তথ্যের মধ্য থেকে সঠিক ও প্রয়োজনীয় তথ্যটি বেছে নেওয়া।
তারা ভিজ্যুয়াল লার্নার: জেন-জি পাতা ভর্তি টেক্সট পড়ার চেয়ে ছবি, ইনফোগ্রাফিকস বা ছোট ভিডিও দেখতে বেশি পছন্দ করে। টিকটক, রিলস বা ইউটিউব শর্টসের যুগে তাদের মনোযোগের সময়কাল বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ বেশ ছোট। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কোনো বিষয় যদি তাদের আগ্রহ তৈরি করতে পারে, তবে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই বিষয়ে ‘হাইপার-ফোকাসড’ থাকতে পারে।
স্বাধীন ও বাস্তবমুখী: এরা স্বাধীনভাবে শিখতে ভালোবাসে। কোনো সমস্যা পড়লে এরা প্রথমে শিক্ষকের কাছে যায় না, যায় গুগলের কাছে। তারা জানতে চায়—‘এই পড়াটা শিখে আমার বাস্তব জীবনে কী লাভ হবে?’ স্রেফ পরীক্ষায় পাসের জন্য মুখস্থ করার প্রবণতা এদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম।
প্রযুক্তির সঙ্গে সখ্য: প্রযুক্তি তাদের কাছে কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার অন্যতম অনুষঙ্গ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে তারা চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য টুল ব্যবহার করে নিজের মতো করে পড়াশোনা গুছিয়ে নিতে অভ্যস্ত।
যেহেতু এই প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব আলাদা, তাই মান্ধাতার আমলের চক-ডাস্টার আর একমুখী লেকচার দিয়ে তাদের ক্লাসরুমে আটকে রাখা সম্ভব নয়। আমাদের শিক্ষা প্রদান পদ্ধতি বা পেডাগজিতে এখন আমূল পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি।
শিক্ষক ক্লাসে আসবেন, ৪৫ মিনিট একটানা লেকচার দেবেন, আর ছাত্ররা চুপচাপ শুনে বাসায় গিয়ে হোমওয়ার্ক করবে—এই প্রথাগত মডেল এখন অচল। এর বদলে এখন বিশ্বজুড়ে ‘ফ্লিপড ক্লাসরুম’ বা উল্টো শ্রেণিকক্ষের ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। এই মডেলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসার আগেই পাঠ্য বিষয়ের মূল ধারণাটি ভিডিও বা ডিজিটাল ম্যাটেরিয়ালের মাধ্যমে বাসায় বসে শিখে আসে। আর ক্লাসের সময়টা বরাদ্দ থাকে আলোচনা, বিতর্ক, গ্রুপ ওয়ার্ক বা জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য। এতে ক্লাসরুম হয়ে ওঠে অনেক বেশি ইন্টারেক্টিভ ও আনন্দদায়ক।
অনেক শিক্ষকই মনে করেন এআই টুলস ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীরা অলস হয়ে যাবে বা চুরি করে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেবে। কিন্তু বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এআইকে ব্লক না করে, এটিকে শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে এআই ব্যবহার করে গবেষণা করতে হয়, কীভাবে সঠিক প্রম্পট দিয়ে জটিল সমস্যার সমাধান বের করতে হয়। এআই হতে পারে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একজন পার্সোনাল ‘এআই টিউটর’।
জেন-জি কাজ করে শিখতে চায়। তাই শুধু থিওরি পড়ানোর বদলে ছোট ছোট প্রজেক্টের মাধ্যমে তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। একটি বিষয় পড়ার পর সেটি তারা বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করতে পারে, তা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থাকতে হবে।
এই বিশাল পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে শুধু শিক্ষকের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্র কাঠামোরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষকদের আধুনিক পেডাগজিক্যাল প্রশিক্ষণ: আমাদের দেশে একটি বড় ভ্রান্ত ধারণা হলো, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থাকলেই ভালো শিক্ষক হওয়া যায়। কিন্তু একজন শিক্ষক যিনি পিএইচডি ডিগ্রিধারী, তিনিও হয়তো জানেন না এই প্রজন্মের একটি শিশুর মনোযোগ কীভাবে ধরে রাখতে হয়। তাই প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত্ত সব স্তরের শিক্ষকদের আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি বা পেডাগজির ওপর ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
স্টেম শিক্ষায় জোর দেওয়া: ভবিষ্যৎ পৃথিবীর কর্মক্ষেত্রের কথা মাথায় রেখে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। মুখস্থনির্ভর বিজ্ঞানের বদলে হাতে-কলমে গবেষণাধর্মী শিক্ষার পরিবেশ স্কুল পর্যায় থেকেই তৈরি করতে হবে।
একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির সেতুবন্ধন: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যা পড়ানো হচ্ছে, তার সঙ্গে করপোরেট বা ইন্ডাস্ট্রিগুলোর বাস্তব কাজের কোনো মিল থাকছে না। এই গ্যাপ কমানোর জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কাউন্সিল’ বা অ্যাডভাইজরি বোর্ড থাকা উচিত, যেখানে করপোরেট লিডাররা এসে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জগতের জন্য প্রস্তুত করবেন।
ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণ: জেন-জির আধুনিক শিক্ষার কথা বলতে গেলে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির সমান অধিকার। শহরের একটি শিশু যে সুবিধা পাচ্ছে, গ্রামের শিশুটি যেন তা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আমরা যদি মনে করি জোর করে আইন চাপিয়ে বা মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে জেন-জি প্রজন্মকে আমরা আমাদের পুরোনো ছাঁচে ফেলে শিক্ষিত করব, তবে তা হবে চরম বোকামি। বরং আমাদের নিজেদেরই বদলাতে হবে। প্রথাগত সিলেবাস আর পরীক্ষার খাতার বাইরে গিয়ে, শিক্ষার উদ্দেশ্যকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সময় এখনই। রাফিদের প্রজন্ম শিখতে চায়, তারা বিশ্ব জয় করার স্বপ্নও দেখে। শুধু তাদের সেই স্বপ্নযাত্রার সঠিক পথপ্রদর্শক হওয়ার জন্য আমাদের পুরোনো শিক্ষার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে।