বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

​​​​​​​রামিসা রহমান

প্রকাশ: ১৯:৫৭, ১৩ জুন ২০২৬

শিক্ষা ব্যয়ের চাপে দিশেহারা পরিবার

শিক্ষা ব্যয়ের চাপে  দিশেহারা পরিবার

বাংলাদেশে শিক্ষা এখন অনেক পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপের একটি। সন্তানের ভালো ভবিষ্যতের আশায় অভিভাবকরা স্কুল, কলেজ, কোচিং, গাইড বই, প্রাইভেট টিউশন, যাতায়াত ডিজিটাল ডিভাইসের খরচ বহন করছেন। কিন্তু আয় সেই হারে না বাড়ায় মধ্যবিত্ত নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মাসের পর মাস চাপে পড়ছে। শিক্ষা মৌলিক অধিকার হলেও বাস্তবে এটি অনেকের কাছে ব্যয়বহুল সেবায় পরিণত হয়েছে।

শহরাঞ্চলে এই চাপ সবচেয়ে বেশি। একটি বেসরকারি স্কুলে সন্তানের পড়াশোনার জন্য মাসিক বেতন, ভর্তি ফি, পরীক্ষা ফি, সেশন চার্জ, ইউনিফর্ম, বই-খাতা কোচিং মিলিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। সরকারি বিদ্যালয়ে পড়লেও অনেক শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট টিউশন বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে কম খরচে শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত হয়ে পড়ছে।

গ্রামাঞ্চলেও শিক্ষা ব্যয় কম নয়। সেখানে স্কুলের বেতন তুলনামূলক কম হলেও প্রাইভেট শিক্ষক, গাইড বই, যাতায়াত, পরীক্ষার ফি ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রীর খরচ পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করছে। অনেক দরিদ্র পরিবার সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে গিয়ে অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দেয়। কেউ কেউ আবার খরচ সামলাতে না পেরে সন্তানকে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে ফেলে।

শিক্ষা ব্যয়ের বড় একটি অংশ এখন যাচ্ছে কোচিং প্রাইভেট টিউশনে। অভিভাবকদের মতে, শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠে অনেক সময় পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় না। ভালো ফলের প্রতিযোগিতা, ভর্তি পরীক্ষা, পাবলিক পরীক্ষা এবং চাকরির প্রস্তুতির কারণে কোচিং এখন প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে শিক্ষার মূল ব্যয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হচ্ছে।

গাইড বই সহায়ক বইয়ের খরচও বাড়ছে। বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেওয়া হলেও অনেক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় ভালো করার জন্য গাইড, মডেল টেস্ট, সাজেশন অনুশীলন বই কিনতে হয়। এসব বইয়ের দামও বছরে বছরে বাড়ছে। ফলে শিক্ষা খরচ শুধু প্রতিষ্ঠানের বেতনে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাজারনির্ভর শিক্ষা ব্যয়।

ডিজিটাল শিক্ষার প্রসারও নতুন ব্যয়ের চাপ তৈরি করেছে। অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, ডিজিটাল কনটেন্ট, স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ এবং ইন্টারনেট এখন অনেক শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু সব পরিবারের পক্ষে এসব খরচ বহন করা সহজ নয়। শহর গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। যাদের ডিভাইস ইন্টারনেট সুবিধা আছে, তারা এগিয়ে যাচ্ছে; আর যাদের নেই, তারা পিছিয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা ব্যয় বাড়ার কারণে সামাজিক বৈষম্যও বাড়ছে। উচ্চ আয়ের পরিবার সন্তানের জন্য ভালো স্কুল, কোচিং, প্রযুক্তি অতিরিক্ত শিক্ষাসুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে। কিন্তু নিম্ন আয়ের পরিবার একই সুযোগ দিতে পারছে না। এতে শিক্ষার শুরুতেই সুযোগের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই বৈষম্য কর্মসংস্থান আয়ের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও ব্যয় একটি বড় বাধা। অনেক পরিবারে অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে ছেলেসন্তানের পড়াশোনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। মেয়েসন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে অনেক পরিবার দ্বিধায় পড়ে। বিশেষ করে মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে যাতায়াত, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসামগ্রী অতিরিক্ত খরচ মেয়েদের শিক্ষায় প্রভাব ফেলতে পারে।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা ব্যয়ের চাপ কমাতে সরকারি সহায়তা আরও কার্যকর করতে হবে। বিনামূল্যে বই বিতরণের পাশাপাশি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম, শিক্ষা উপকরণ, যাতায়াত সহায়তা এবং ডিজিটাল ডিভাইস সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। উপবৃত্তি কার্যক্রম আরও লক্ষ্যভিত্তিক করা দরকার, যাতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো সরাসরি সুবিধা পায়।

একই সঙ্গে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়ানো জরুরি। যদি সরকারি স্কুল-কলেজে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অভিভাবকদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কোচিং অতিরিক্ত টিউশনের ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে পরিবারের শিক্ষা ব্যয়ও কমতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, ল্যাব-লাইব্রেরি উন্নয়ন এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। সেই বরাদ্দের একটি বড় অংশ সরাসরি শিক্ষার্থীর ব্যয় কমাতে ব্যবহার করতে হবে। দরিদ্র নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য শিক্ষা সহায়তা, স্কুলভিত্তিক খাবার কর্মসূচি, বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ এবং প্রযুক্তি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যয় এখন সাধারণ পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। শিক্ষা যদি ব্যয়ের চাপে সীমিত হয়ে যায়, তাহলে দরিদ্র মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পিছিয়ে পড়বে। তাই শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে সবার জন্য সহজলভ্য করতে হলে পরিবারভিত্তিক ব্যয় কমানো, সরকারি শিক্ষার মান বাড়ানো এবং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষা ব্যয় কমানো শুধু পরিবারের স্বস্তির বিষয় নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।