কৃষকের উঠোন থেকে রাষ্ট্রপতির চেয়ার
শিক্ষার জাদুকরী শক্তিতে যেভাবে পাল্টে যায় ভাগ্য
কয়েক দশক আগের কথা। উত্তরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের নাম না জানা এক কৃষক পরিবার। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে কৃষকের ঘরে যখন রাতের আঁধার নামত, তখন একমাত্র সম্বল ছিল টিমটিমে জ্বলতে থাকা একটি কুপিবাতি। সেই বাতির ম্লান আলোয় বইয়ের পাতায় চোখ রাখত কৃষকের ছোট মেয়েটি। অভাবের তাড়নায় পেটে ক্ষুধা, পরনে পুরোনো মলিন জামা। কিন্তু মেয়েটির চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। গ্রামের অনেকেই তখন বলত, ‘কৃষকের মেয়ে তো বড়জোর আরেক কৃষকের ঘরের বউ হবে, এত পড়াশোনা করে কী লাভ!’ কিন্তু সেই মেয়েটি আজ দেশের অন্যতম সেরা একটি হাসপাতালের প্রধান শল্যচিকিৎসক। তার হাতের ছোঁয়ায় প্রতিদিন নতুন জীবন ফিরে পাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।
এই গল্পটি শুধু ওই মেয়েটির একার নয়। এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর শিক্ষার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার এক বাস্তব উদাহরণ। দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ঠিক এই কথাটিই খুব সুন্দর করে বলেছিলেন। তার মতে, শিক্ষা হলো মানুষের নিজের ভাগ্য বদলানোর সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী ইঞ্জিন। একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই একজন সাধারণ কৃষকের মেয়ে হয়ে উঠতে পারে বিশ্বমানের চিকিৎসক। এই শিক্ষার জোরেই খনি শ্রমিকের ছেলে একদিন সেই খনির প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারে। এমনকি মাঠে কাজ করা অতি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানও একদিন একটি স্বাধীন ও মহান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
জন্মের সময় আমরা কী নিয়ে পৃথিবীতে এলাম, কোন ঘরে আমাদের জন্ম হলো, কিংবা বাবা-মায়ের কত সম্পদ আছে—এসব দিয়ে আসলে মানুষের সত্যিকারের পরিচয় নির্ধারণ করা যায় না। ম্যান্ডেলার ভাষায়, জন্মসূত্রে আমরা কী পেয়েছি, তা নয়, বরং আমাদের যা কিছু আছে তা দিয়ে আমরা নিজেদের কী হিসেবে গড়ে তুলছি, এটাই এক মানুষকে আরেক মানুষের চেয়ে আলাদা করে। আর এই গড়ে তোলার পথে সবচেয়ে বড় জাদুকঠি হলো শিক্ষা। শিক্ষা মানুষকে শুধু অক্ষরজ্ঞানই দেয় না, এটি মানুষের মনের জানালা খুলে দেয়, সাহস জোগায় এবং স্বপ্নের সমান বড় হতে শেখায়।
তবে গল্পের এই সুন্দর রূপটি বাস্তব জীবনে সবসময় এত সহজে ধরা দেয় না। আমাদের সমাজে এখনো অসংখ্য মেধাবী শিশু ঝরে পড়ে শুধু সুযোগের অভাবে। তাই শিক্ষার এই জাদুকরী শক্তিকে যদি আমরা প্রতিটি ঘরের প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছে দিতে চাই, তবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের অনেক বড় একটি ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু বড় বড় ইমারত বানালেই শিক্ষার মান বাড়ে না, এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা।
প্রথমত, নীতিনির্ধারকদের নিশ্চিত করতে হবে যেন শহর ও গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থায় পাহাড়সম বৈষম্য না থাকে। রাজধানীর একটি নামিদামি স্কুলের শিশু যে মানের শিক্ষা পাচ্ছে, হাওর বা পাহাড়ের দুর্গম এলাকার শিশুটিরও ঠিক একই মানের শিক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে। এই বৈষম্য দূর করতে হলে গ্রাম ও মফস্বলের স্কুলগুলোয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া পৌঁছে দিতে হবে। প্রতিটি স্কুলে ডিজিটাল ল্যাব, উন্নত লাইব্রেরি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করাটা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং যুগের দাবি।
শিক্ষাব্যবস্থার মূল কারিগর হলেন শিক্ষকরা। তাই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের শিক্ষকদের জীবনমান এবং প্রশিক্ষণের দিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। একজন শিক্ষক যদি নিজের পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খান, তবে তিনি কখনোই শ্রেণিকক্ষে তার শতভাগ উজাড় করে দিতে পারবেন না। তাই শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক বেতন কাঠামো এবং নিয়মিত আধুনিক বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। মেধাবীরা যেন শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হন, সেই পরিবেশ রাষ্ট্রকেই তৈরি করতে হবে।
এর পাশাপাশি আমাদের পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন শুধু মুখস্থ বিদ্যার কারখানা না হয়। পরীক্ষায় কে কত বেশি নম্বর পেল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সে কতটা শিখল এবং বাস্তব জীবনে তা কতটা কাজে লাগাতে পারল। নীতিনির্ধারকদের উচিত এমন একটি কারিকুলাম প্রণয়ন করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং নৈতিকতার শিক্ষা পায়। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আরও সহজলভ্য ও সম্মানজনক করে তুলতে হবে, যাতে পড়াশোনা শেষ করে কাউকে বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘুরতে না হয়।
অর্থনৈতিক বাধা যেন কোনোভাবেই শিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে ব্যাপারেও সরকারকে কঠোর হতে হবে। প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ এবং স্কুলগুলোয় দুপুরের পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা আরও ব্যাপকভাবে চালু করতে হবে। একটি শিশু যখন জানবে যে স্কুলে গেলে তার পেট ভরবে এবং বই-খাতার জন্য বাবাকে ঋণ করতে হবে না, তখন সে আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে পড়াশোনা করবে।
দিন শেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মাটির নিচের তেল বা সোনা নয়; একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ হলো তার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। যেদিন এই দেশের প্রতিটি সাধারণ ঘরের সন্তান বিশ্বাস করতে শিখবে যে, তার মেধা এবং পরিশ্রমই তার সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি সেদিন আমাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। যেদিন কৃষকের উঠোন থেকে উঠে আসা ছেলেটি কোনো রকম দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতি ছাড়াই শুধু নিজের যোগ্যতায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছাতে পারবে, সেদিনই আমরা ম্যান্ডেলার সেই স্বপ্নের সমাজের দেখা পাব। আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ি যেখানে প্রতিটি শিশু তার মেধার ডানা মেলার সমান আকাশ পায়। কারণ শিক্ষার আলোই পারে একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর থেকে আগামীর বিশ্বনেতার জন্ম দিতে।