বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রকাশ: ১৯:২৪, ৬ মে ২০২৪ | আপডেট: ১৯:২৪, ৬ মে ২০২৪

বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ে ব্যস্ত বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক

বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ে ব্যস্ত বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক

প্রতিনিধি, রাজশাহী : রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা এখন পুরোপুরি ব্যস্ত তাদের বোরো ধান কাটা এবং মাড়াইয়ের কাজে। মাঠভরা সবুজ ধানের শীষ এখন কৃষকদের মুখের হাসি। তবে যন্ত্রের অভাবে এখনও শ্রমিকের চাহিদা অটুট রয়েছে এই অঞ্চলে। বোরো মৌসুমের এই শেষ পর্বে ধান কাটা এবং মাড়াই করে খাদ্যভাণ্ডার পূরণের চেষ্টায় রাত-দিন এক করে দিয়েছেন কৃষকরা। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই মাড়াই কাজ। আবহাওয়া সহায়ক হলেও ফলনে অনিশ্চয়তা এখনও তাদের মনে দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করেছে। তীব্র গরমের মাঝেও ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। মাঠজুড়ে কৃষক-শ্রমিকদের ব্যস্ততার শেষ নেই। আধুনিক যন্ত্রের ব্যাপক পরিচিতি ও প্রচলন না ঘটার কারণে এখনও রয়েছে শ্রমিকের চাহিদা। গভীর রাত পর্যন্ত চলছে ধান মাড়াইয়ের কাজ। কৃষকরা বলছেন, চলতি মৌসুমে বেশিরভাগ জমিতেই উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের চাষ করা হয়েছে। মৌসুম শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে স্থানীয় জাতের ধান ভালো হয়নি। তাহাড়া ধানের গাছ ভালো হলেও চাষিদের দুশ্চিন্তা এখনও রয়েছে। আবহাওয়া যদি ভালো থাকে, তবে ফলনও ভালো হবে এমনটা আশা করেন তারা। মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌর এলাকার বাকশৈল মহল্লার কৃষক আবদুস সাত্তার জানিয়েছেন আউশ ধান কাটা মাড়াই শেষ পর্যায়ে। এবার খরা এবং পোকার আক্রমণের কারণে ফলন কিছুটা কম হয়েছে। আশা ছিল প্রতি বিঘায় ২০ মণ ধান ফলবে কিন্তু প্রতি বিঘায় ফলন হয়েছে ১৬ থেকে ১৭ মণ। হরিদাগাছি মহল্লার কৃষক ওবায়দুর রহমান জানিয়েছেন ধানের গাছপাত খুব ভালো হয়েছিল। আশা ছিল ভালো ফলন হবে। তবে জমিতে গিয়ে দেখছি শীষ হালেনি। অর্ধেক ধান চিটা। এ থেকে ধারণা করছি ফলন ভালো হবে না। আবদুর রাজ্জাক নামের অপর একজন কৃষক জানিয়েছেন ধান কাটা-মাড়াইয়ের মন খুব খারাপ। বেশি ভাগ ধান মরা। ফলন অর্ধেক হয়েছে। পোকা লাগছিল কিন্তু বুঝতে পারিনি। কৃষি বিভাগের দাবি কিছু কৃষকদের অসাবধানতার কারণে দুই এক স্থানের ক্ষেতে নতুন রোগ এবং ইঁদুরের সামান্য উপদ্রব ছিল। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির ফলে উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২০২৪ মৌসুমে ৭০ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন চাল। চাষিরা জিরা, কাটারি, বিআর-২৬ ও ২১, ব্রি-২৮, ৫৬, ৬৫, ৮২, ৮৮, ৮৬, ৮৯, ৯২ বিনা-২৫, বঙ্গবন্ধু-১০০ পারিজা ও হাইব্রিড হীরা জাতের ধান চাষাবাদ করেছেন। এখন পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে শতকরা প্রায় ৫ ভাগ জমির ধান কাটা-মাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। আর ৪ দশমিক ৮২ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়। স্থানীয় কৃষি অফিসের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে যাতে তারা আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে আরও দক্ষ হতে পারেন এবং তাদের উৎপাদন খরচ কমাতে পারেন। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোছা. উম্মে ছালমা বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা বর্তমানে বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ে ব্যস্ত। এই অঞ্চলে বোরো ধানের চাষ অত্যন্ত জনপ্রিয় কারণ এখানে মাটির গুণাগুণ এবং জলাবায়ু ধান চাষের জন্য উপযুক্ত। কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে আমরা লক্ষ্য করছি, এ বছর ধানের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। কৃষকরা আধুনিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তি গ্রহণ করে ফলন বৃদ্ধির চেষ্টা করেছেন। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের শ্রমিকের অভাব এবং মজুরির হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করেছে। তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের ওপর বাজারজাতকরণের কৌশল উন্নত করার জন্য কাজ করছি, যাতে তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পান। কৃষকদের আর্থিক সাহায্য ও ঋণের সুবিধা প্রদান ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানোর চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফজলুল ইসলাম বলেন, দাবদাহের কারণে শস্যের ফলনে কিছুটা কমতি দেখা দিতে পারে। তবে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব। ধানের ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। বরং পাকা ধান শুকাতে সুবিধা হবে। আর পোকার আক্রমণ নেই বললেই চলে। এ বছর বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি হবে, যা কৃষকদের জন্য খুবই ভালো খবর। এছাড়া বোরো ধানের জমিতে এবার কোনো ধরনের পোকামাকড় বা রোগবালাইয়ের আক্রমণ না থাকায় ধানের ফলন অনেক ভালো হবে। তিনি বলেন, ভালো ফলনের প্রভাব শুধু কৃষকদের ওপরই নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দেশে চালের দাম স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং এতে করে সাধারণ মানুষের ওপর বাজারের মূল্যবৃদ্ধির চাপ কম পড়বে। অতিরিক্ত ফলনের কারণে বাজারে চালের যোগান বেড়ে যাবে, যা খুচরা বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। এই বছরের উন্নত ফলন আগামী দিনগুলোতে কৃষি গবেষণা ও কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নে নতুন উৎসাহ যোগাবে।