১৯০৬ সালের সেই প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প এবং তার পরবর্তী ভয়াবহ দাবানলে পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল পুরো সান ফ্রান্সিসকো শহর। ছাইয়ে পরিণত হয়েছিল শহরের প্রাচীনতম সচল গ্রন্থাগার ‘মেকানিকস ইনস্টিটিউট’-এর প্রায় দুই লাখ বই। কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল, আগুনের গ্রাস থেকে কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু অলৌকিক ঘটনাটি ঘটল এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর। সম্প্রতি আগুনে আংশিক পোড়া এবং পাতায় পাতায় কালির মতো ভুসো কালির দাগ মাখা একটি বই অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছে তার পুরোনো ঠিকানায়, যা রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।
১৮৭৪ সালের ১০ ডিসেম্বর মেকানিকস ইনস্টিটিউটের সিলমোহর দেওয়া ‘ইকোস অব দ্য ফুট-হিলস’ নামের এই ঐতিহাসিক বইটি সম্প্রতি উদ্ধার করেছেন র্যান্ডাল শোয়েড নামের এক মার্কিন সংগ্রাহক। একটি অনলাইন কেনাবেচার প্ল্যাটফর্মে মাত্র ৩৫ ডলারে বইটি খুঁজে পান তিনি। বইটির গায়ে আগুনের ক্ষত দেখেই শোয়েড বুঝতে পেরেছিলেন, এটি কোনো সাধারণ বই নয়, বরং ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। সান ফ্রান্সিসকোর স্বর্ণখনির উত্থানের গল্প বলা এই বইটি পাওয়ার পর শোয়েডের মনে হয়েছিল, এর আসল জায়গা কোনো ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা নয়, বরং এর নিজের বাড়ি। সেই ভাবনা থেকেই গত ডিসেম্বরে তিনি বইটি লাইব্রেরিতে ফেরত দেন।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকা এই বই কীভাবে আগুনের মুখ থেকে বেঁচে ফিরল, তা নিয়ে এখন লাইব্রেরি ম্যানেজার মাইলস কুপারসহ গবেষকদের কৌতূহলের শেষ নেই। বইটি কি সেই সময় কেউ পড়ার জন্য বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন? নাকি কেউ ধ্বংসস্তূপ থেকে এটিকে উদ্ধার করে লুকিয়ে রেখেছিলেন? বইটির প্রথম পাতায় ‘অ্যাগনেস কুইগলি’ নামে এক নারীর নাম লেখা রয়েছে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৮৯৮ সালে সান ফ্রান্সিসকোর একটি স্থানীয় পত্রিকায় এই নামের এক তরুণী গৃহকর্মী ও শিশু যত্নকারীর কাজের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, কুইগলি নামের সেই নারীই হয়তো বইটি লাইব্রেরি থেকে ধার নিয়েছিলেন, অথবা ভূমিকম্পের পর লন্ডভন্ড শহরের কোনো ধ্বংসস্তূপ থেকে কুড়িয়ে পেয়ে নিজের নাম লিখে রেখেছিলেন। কারণ, সেই সময়ে সান ফ্রান্সিসকোতে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছিল।
অবশ্য এই বইটিকে মেকানিকস ইনস্টিটিউটের একমাত্র ‘সারভাইভার’ বা বেঁচে যাওয়া বই বলা যাবে না। ভূমিকম্পের সময় অন্য একটি নিরাপদ স্থানে থাকা কিছু নথিপত্র এবং ‘ম্যারেজেস, রাইটস, কাস্টমস অ্যান্ড সেরেমনিস’ নামের আরেকটি বইও রক্ষা পেয়েছিল, যা ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। তবে নতুন ফিরে আসা এই বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এটিকে আর সাধারণ পাঠকদের জন্য ইস্যু করা হবে না। সান ফ্রান্সিসকোর ১৮৫৪ সালের একটি প্রাচীন মানচিত্রের নিচে একটি কাচের বাক্সে এটিকে পরম যত্নে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
১৮৫০-এর দশকে মূলত স্বর্ণখনি শ্রমিকদের শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে এই মেকানিকস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯০৬ সালের জানুয়ারিতে অন্য একটি লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি শহরের বৃহত্তম গ্রন্থাগারে পরিণত হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, তার মাত্র তিন মাস পরেই প্রলয়ংকরী দুর্যোগে লাইব্রেরি ভবনটি ধূলিসাৎ হয়ে যায়, টিকে ছিল মাত্র একটি দেয়াল। এরপর সান ফ্রান্সিসকোর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনুদানের অর্থ এবং বইয়ের সাহায্যে আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয় এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই ভয়াবহ ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী আর বেঁচে নেই। মানুষের মুখে মুখেই বেঁচে আছে সেই ইতিহাস। দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো ‘ইকোস অব দ্য ফুট-হিলস’ বইটি এখন তার জীবনের তিনজন মালিক—কুইগলি, শোয়েড এবং মেকানিকস ইনস্টিটিউটের স্মৃতি বহন করছে। লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বইটির ভেতরে এর অলৌকিক বেঁচে থাকার এবং ফিরে আসার গল্পটি লিখে রাখা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে যে ইতিহাস কখনো হারিয়ে যায় না, ঘুরেফিরে ঠিকই নিজের জায়গায় ফিরে আসে।
সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/কেএইচটি