প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁর সঙ্গে যথাযথ ব্যবহার করা হয়নি। ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি দেশে ফিরে এসেছেন।
গতকাল সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলনকক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘এই সরকার ও রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছি। ফলে আমার সঙ্গে সেখানে যা হয়েছে, আমার কাছে মনে হলো আমাদের ইনস্ট্যান্ট (তাৎক্ষণিক) একটা প্রতিবাদ হওয়া দরকার। সেই কারণে আসলে আমি ফেরত আসার সিদ্ধান্ত নিই। যদিও একটা পর্যায়ে তারা (ভারতীয় কর্তৃপক্ষ) খুব চেষ্টা করেছে আমি যেন প্রবেশ করি এবং আমার নিয়মিত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করি। কিন্তু আমি সেটা করিনি।’
তিনি বলেন, ‘পুরো সময়টা ভারতে নিযুক্ত আমাদের হাইকমিশনার পাশে ছিলেন, তিনি তাঁর জায়গা থেকে সমাধান করার চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে।’ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘এই সরকারের ও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা হিসেবে আমার মনে হয়েছে, রাষ্ট্র হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে একটা “সিগনেচার” থাকা দরকার। আমার কখনো এই উদ্দেশ্য নেই যে এটার মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি কোনো নেগেটিভ পরিস্থিতি তৈরি হোক। আমার মনে হয়েছে একটা মেসেজ এই দেশ ও এই দেশের বাইরে সবার কাছে যাওয়া দরকার, সেটা হচ্ছে এটা শেখ হাসিনার সরকার না। এটা জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত একটা সরকার।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারকে দেশের ভিতরে ও বাইরে সব জায়গায়, সেটা মাথায় রেখেই চলতে হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত না শুধু, অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে ভবিষ্যতে যেকোনো এনগেজমেন্টে আমরা আমাদের একটা সুস্পষ্ট নীতি আছে। কোনোভাবেই আমরা চাই না, কোনো দেশের সঙ্গে খুব খারাপ কোনো পরিস্থিতি হোক, কোনো শত্রুতা তো দূরেই থাকুক।’
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দুই দেশের সম্পর্ক প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা চাই না কোনো খারাপ পরিস্থিতি হোক। তবে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বজায় রেখে।’ বিমানবন্দরের ঘটনায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা হচ্ছে এবং সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
পরবর্তী সময়ে ভারত থেকে আমন্ত্রণ পেলে যাবেন কি না, জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যাব। আমি এ কথাটা খুব স্পষ্ট করে দিচ্ছি, আমি যদি যথাযথ আমন্ত্রণ পাই, আমি নিশ্চয়ই যাব। আমি ভারতের সঙ্গে এনগেজ করতে চাই, লজিক্যালি অ্যান্ড রেশনালি। ভারতের সঙ্গে এনগেজ করার কথা বললে কারও কারও মনে হয় আমি দেশ বিকিয়ে দিতে যাচ্ছি। বাংলাদেশ বিকিয়ে দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এই সরকার কখনো করবে না। সবার আগে বাংলাদেশ বলছি আমরা। সুতরাং ভারতের সঙ্গে এনগেজ করতে চাই, সমমর্যাদার ভিত্তিতে ব্যবসাবাণিজ্যসহ আরও অনেক কিছুতে উন্নতি করার সুযোগ আছে।’
পাসপোর্টসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘কূটনৈতিক পাসপোর্ট আমি নিইনি। কূটনৈতিক পাসপোর্ট কোনো কারণ না। কারণ আমার পাসপোর্টে সার্ক স্টিকার দেওয়া হয়েছে, তার মানে কূটনৈতিক পাসপোর্ট যেভাবে কাজ করে, এটা সেভাবেই কার্যকর হওয়ার কথা। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে পাসপোর্ট কারণ ছিল, কিন্তু পাসপোর্ট কারণ ছিল না, অন্য কারণ ছিল, এগুলো ইন্ডিয়ান মিডিয়াতে এলেও কমবেশি এসেছে।’
প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়টি অন্তত দুই দিন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল বাংলাদেশ। গত রবিবার ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ) সম্মেলনে অংশ নিতে দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হয়। শুরুতে ভারতে প্রবেশের অনুমতিও দেওয়া হয়নি। পরে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে ঢাকায় ফিরে আসেন।
বেনজীরকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে : প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। এ সময় জাহেদ উর রহমান বলেন, দুর্নীতি, পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া চলছে। এটি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সাফল্য বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও ও জামালপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) থেকে ১৩১ জন নাগরিককে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর অবস্থানের কারণে এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। একই সময়ে মিয়ানমার সীমান্তে ৮৯ জনের অনুপ্রবেশের চেষ্টাও ব্যর্থ করা হয় এবং ২১ জন বাংলাদেশি নাগরিকের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সম্মেলনে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, চোরাচালান প্রতিরোধ, সমন্বিত টহল জোরদার এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।