জাস্ট ফন্টেইন, মিশেল প্লাতিনি, জঁ-পিয়ের পাপিন, থিয়েরি অঁরি কিংবা অলিভিয়ের জিরু; ফরাসি ফুটবলে কিংবদন্তি ফরোয়ার্ডের অভাব কখনোই ছিল না। কিন্তু গোল করার দক্ষতার দিক থেকে সবাইকে ছাড়িয়ে এবার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছালেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২০২৬ বিশ্বকাপের নিজেদের প্রথম ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। মাত্র ২৭ বছর বয়সে অলিভিয়ের জিরুকে টপকে ফরাসি জার্সিতে নিজের ৫৮তম গোলটি তুলে নেন তিনি।
ম্যাচটিতে ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করা সাবেক রেকর্ডধারী জিরু নিজেই এমবাপ্পেকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এটি অনুমেয়ই ছিল। এমবাপ্পে ফ্রান্সের হয়ে সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দেবেন। জিরুর ধারণা, এমবাপ্পে খুব সহজেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করবেন এবং বিশ্বকাপে মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডটিও নিজের করে নেবেন। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোলের পর বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোল সংখ্যা এখন ১৪, যা ক্লোসার চেয়ে মাত্র দুটি কম। মাত্র ৯৯ ম্যাচে ৫৮ গোল করা এমবাপ্পেকে একজন জন্মগত নেতা এবং অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে আখ্যা দেন জিরু।
ফরাসি ফুটবল বিশেষজ্ঞ জুলিয়েন লরেন্সের মতে, এমবাপ্পে একদিন ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। বর্তমানে জিনেদিন জিদান এবং মিশেল প্লাতিনিকে ফ্রান্সের সেরা দুই খেলোয়াড় বিবেচনা করা হলেও, লরেন্সের ভবিষ্যৎবাণী হচ্ছে, ক্যারিয়ারের শেষে এমবাপ্পেই হবেন দেশটির এক নম্বর ফুটবলার। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২২ সালের ফাইনালের হ্যাটট্রিকসহ তার নেতৃত্বের গুণাবলী তাকে ইতোমধ্যেই অনন্য করে তুলেছে।
অথচ এই মহাতারকার গল্পটা শুরু হয়েছিল প্যারিসের শহরতলি বন্ডির এক সাধারণ ফ্ল্যাট থেকে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের মাত্র পাঁচ মাস পর জন্ম নেন এমবাপ্পে। তার পুরো পরিবার শুরু থেকেই তাকে বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় নিয়ে যাওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেছিল, যাকে বলা হয় ‘প্রজেক্ট এমবাপ্পে’। শৈশবের বন্ধুরা জানান, এমবাপ্পের জীবন ছিল শুধু স্কুল আর ফুটবলেই সীমাবদ্ধ। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত মুখস্থ করেছিলেন, যাতে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সময় গাইতে পারেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে আদর্শ মেনে এবং জিদানের খেলা দেখে বড় হওয়া এমবাপ্পে ছোটবেলা থেকেই সমবয়সীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন।
মাত্র ১৬ বছর ৩৪৭ দিন বয়সে মোনাকোর হয়ে অঁরির রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন এমবাপ্পে। এর তিন মাস পর ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাও হন তিনি। ২০১৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদের প্রস্তাব ফিরিয়ে রেকর্ড ১৬৫.৭ মিলিয়ন পাউন্ডে পিএসজিতে যোগ দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি কিশোর খেলোয়াড় বনে যান। এরপরের গল্পটা শুধুই সাফল্যের। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে পেলের পর দ্বিতীয় কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে গোল করেন এবং টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় হন।
কৈশোরে মোনাকোর একটি অ্যাসাইনমেন্টে ম্যাগাজিনের কভার ডিজাইন করতে বলা হলে এমবাপ্পে বিশ্বখ্যাত ‘টাইম ম্যাগাজিন’ বেছে নিয়ে শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘এল মায়েস্ত্রো’ বা দ্য মাস্টার। এর মাত্র চার বছর পর সত্যি সত্যিই টাইম ম্যাগাজিনের কভারে জায়গা করে নেন তিনি। ২০২৩ সালে ফ্রান্স দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার খেলায় আরও পরিপক্বতা এসেছে। যদিও এখনো ব্যালন ডি’অর বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি ছোঁয়া হয়নি তার, তবে ফুটবল বোদ্ধাদের বিশ্বাস, ক্যারিয়ার শেষ করার আগে ট্রফি ক্যাবিনেট এবং ব্যক্তিগত অর্জনে তিনি জিদান ও প্লাতিনিকেও ছাড়িয়ে যাবেন। ‘প্রজেক্ট এমবাপ্পে’র জয়রথ যে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবে, সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে তার বর্তমান পারফরম্যান্স।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ