কোরবানির ঈদ শেষ হওয়ার ১৯দিন পার হলেও সংগৃহিত পশুর চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না চট্টগ্রামের আড়তদররা। সাধারণত প্রথম কিংবা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে লবণযুক্ত চামড়াগুলো ঢাকার আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা সংগ্রহ করলেও এবার তার ব্যাতিক্রম।
অনেক ট্যানারি চামড়া কিনতে চাইলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দাম দিতে চাওয়ায় বিক্রি করতে পারছেন না চট্টগ্রামের প্রক্রিয়াজাতকারীরা।
জানা গেছে, গত কোরবানির ঈদে চট্টগ্রাম মহানগর ও ১৫ উপজেলায় চার লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো। কোরবানি দাতারা ১’শ থেকে ৩’শ টাকায় সেই চামড়া বিক্রি করেছেন। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৪০টি কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করেছিলেন চট্টগ্রামের আড়তদাররা। এর মধ্যে গরুর চামড়া ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০টি, ছাগলের চামড়া ৫৩ হাজার ৮’শটি এবং মহিষের চামড়া ১১ হাজার ৯৫০টি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সংগৃহিত এসব চামড়া ছাড়াও চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোরবানির ঈদে পর্যাপ্ত দাম না পেয়ে অনেক কোরবানিদাতা বিনামূল্যে বেশকিছু চামড়া বিভিন্ন এলাকায় এতিমখানায় দান করে দিয়েছেন। আবার অনেকে ঝামেলা এড়াতে ঈদের দিনেই ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন কাঁচা চামড়া। এছাড়া মফস্বল এলাকা থেকে সংগ্রহ করা চামড়ার দাম না পেয়ে রাস্তায় ফেলে গেছেন অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ী। সিটি করপোরেশন পরে সেগুলো পরিষ্কার করে।
এমন পরিস্থিতিতে সংগৃহিত চামড়াগুলো নগরীর আতুরার ডিপো এলাকায় কাঁচা চামড়ার আড়তে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করেছেন আড়তদাররা। এসব চামড়া তিন মাস সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও সাধারণত কোরবানির ঈদের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকার ট্যানারি ও আড়তদাররা কিনে নিয়ে যান। কিন্তু এবার ঢাকার ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে চামড়া কিনতে চাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এখানকার আড়তদাররা।
আড়তদার সমিতির নেতারা জানান, অনেক আড়তদার নিজস্ব গুদামে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করেছেন। তবে অনেকেই আবার প্লাস্টিকের ত্রিপল দিয়ে অস্থায়ী গুদাম তৈরি করে লবণ দিয়ে কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করেছেন। দ্রুত সময়ে চামড়া বিক্রি করতে না পারলে সামনে বর্ষা মৌসুম চলে আসায় বৃষ্টির পানি নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন অনেক আড়তদার।
আড়তদাররা জানান, এবারের ঈদে ঢাকার বাইরের জন্য ট্যানারি মালিক ও সরকার কোরবানির পশুর চামড়ার নির্ধারিত দাম ছিলো প্রতি বর্গফুট ৫৬-৬২ টাকা। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা থেকে আসা ক্রেতারা ৩৫-৪০ টাকার বেশি দাম দিতে চাইছেন না। আবার প্রতিটি চামড়ায় নষ্ট অংশ হিসেবে সাধারণত ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাদ দিয়ে হিসেব করা হয়। এই অবস্থায় চরম লোকসানের মুখে পড়ছেন চট্টগ্রামের আড়তদাররা।
জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, কোরবানির আগে সরকার পশুর চামড়া সংগ্রহে নানা উদ্যোগ নিলেও পরে আর খবর রাখে না। মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহ করেন আড়তদাররা। কিন্তু সরকার সকল সুবিধা দেয় ট্যানারি মালিকদের। এখন সরকার নির্ধারিত দামের অর্ধেকে ট্যানারিগুলো চামড়া কিনতে চাচ্ছে। এতে আড়তদারদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
সমিতির সহসভাপতি মুহাম্মদ শাহজাহান জানান, ঢাকার ট্যানারিগুলোর কাছে চট্টগ্রামের আড়তদারদের বিগত বছরগুলোর ২০ কোটি টাকার উপরে বকেয়া পাওনা আছে। একারণে অনেকেই পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। ১৫০টি আড়ত থেকে ৩০টি আড়তে নেমে এসেছে। এখন ট্যানারিগুলো সিন্ডিকেট করে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে চামড়া কিনতে চাচ্ছে। এতে বাকী আড়তদাররাও ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
জানা গেছে, এক সময় চট্টগ্রামে বেশকিছু ট্যানারি থাকলেও বর্তমানে একটিমাত্র ট্যানারি টিকে আছে। ফলে ঢাকার ট্যানারির ওপর নির্ভর করে ব্যবসা পরিচালনা করেন চট্টগ্রামের আড়তদাররা। কিন্তু এর মধ্যে নানা সংকটে এখানকার বিপুল সম্ভাবনাময়ী চামড়াখাত ধুঁকে ধুঁকে চলছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর চামড়া খাত আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর সঙ্গে লবণের দাম বৃদ্ধি, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের পুরনো বকেয়া পরিশোধ না করায় পুঁজির ঘাটতি, শ্রমিক ও পরিবহণ ব্যায় বৃদ্ধি নিয়ে দুশ্চিন্তা তাদের পিছু ছাড়ছেনা।
বিডি প্রতিদিন/আরকে