মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা চুক্তিটি যদি শেষ মুহূর্তে কোনো বাধা ছাড়াই কার্যকর হয়, তবে এটি এমন একটি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে, বিশ্লেষকদের মতে, যা ছিল ট্রাম্পের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতিগত ভুল।
এ যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে না, বরং বিশ্বজুড়ে ওয়াশিংটনের প্রভাব ও মিত্রদের আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলেছে।
বিবিসির আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক জেরেমি বোয়েনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। তার মতে, এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের নিরুৎসাহিত করার সক্ষমতা দুর্বল করেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ আরব রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও চাপ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার মধ্যে স্থিতিশীলতার দ্বীপ হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুনভাবে ভাবছে। এসব দেশের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে বিকল্প জোট এবং প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরান যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তখন চীনও পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। ওয়াশিংটনের সামরিক সক্ষমতার বাস্তব সীমা কোথায়, তা এই সংঘাত থেকে স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
যুদ্ধের সমাপ্তি, তবে এটি শান্তিচুক্তি নয় : সমঝোতা স্মারকটি যুদ্ধের অবসান ঘটালেও এটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নয়। আলোচনাকারীরা জানিয়েছেন, দুই পৃষ্ঠার ১৪টি ধারা নিয়ে তৈরি এই নথির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বন্দর ঘিরে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের বিষয়ও এতে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভুল হিসাব : বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে ভুল হিসাব করেছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের আগে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ধারণা করেছিল, দ্রুত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং টিকে থাকার মাধ্যমে ইরানের শাসকগোষ্ঠী আরও শক্ত অবস্থানে ফিরেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের হত্যার পরও দেশটির নেতৃত্ব কাঠামো দ্রুত পুনর্গঠিত হয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খামেনির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রভাবশালী কমান্ডারদের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। তারা আগের নেতৃত্বের মতোই আদর্শিক হলেও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও আগ্রাসী বলে মনে করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ তৈরি করবে : বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস ও আদর্শগত সংঘাতের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত। এ যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্যই ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। -বিবিসি
ইরানের জনগণ এখনো কঠোর শাসনের অধীনে রয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি ধরে রাখলেও ট্রাম্পের যুদ্ধ সিদ্ধান্তকে এমন এক পরাশক্তির পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যে পরিবর্তনশীল বিশ্বে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে লড়াই করছে। -বিবিসি