এক সময়ের পুরোনো দিল্লি, তারপর নয়াদিল্লি, এখন গুরুগ্রাম আর নয়ডাসহ বৃহত্তর দিল্লি- তারপরও চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ভারতের রাজধানীকে। পড়াশোনা, কাজের সুযোগ, উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পেতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন মানুষ দিল্লিতে আসে। ২০১১ সালে দিল্লিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১১ হাজার ৩২০ জন মানুষ বাস করতো, ২০৪১ সালের মধ্যে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২০ হাজার ৭৭০ জন মানুষ থাকতে চাবেন। ২০১১ সালের দিল্লির জনসংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৮১ লাখ, ২০৪১ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ১১ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিদ্যমান অবকাঠামোয় জনসংখ্যার এ বিশাল স্রোতকে ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই ভারত সরকার জাতীয় রাজধানী অঞ্চল (এনসিআর) পরিকল্পনা ২০৪১ হাতে নিয়েছে। এটি হলো দিল্লি এবং এর আশপাশের এলাকায় সুষম ও পরিকল্পিত উন্নয়নের এক সুদূরপ্রসারী ও উচ্চাভিলাসী মহাপরিকল্পনা। উচ্চাভিলাসী হলেও রাজধানীকে বাঁচাতে এছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য দিল্লির কেন্দ্রের চাপ আশপাশে ছড়িয়ে দেওয়া। এনসিআর ২০৪১-তে দিল্লির সীমানার তিন রাজ্য হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানের বিশাল অংশও অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল মেগাসিটি গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যার নাম হবে দিল্লি-এনসিআর। ধারণাটাই এমন দূরে থেকেও কাছে থাকা। আপনি দিল্লিতে থাকবেন, কিন্তু দিল্লিতে নয়। আবার রাজস্থানে থেকেও আপনি দিল্লি বাসের অনুভূতি পাবেন।
এই মহাপরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে আছে দুটি ধারণা। উন্নয়নকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং দূরকে কাছে আনা। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দিল্লির চারপাশে চারটি আধুনিক নমো শহর গড়ে তোলা হবে। আর পুরো দিল্লি-এনসিআর’কে বেধে ফেলা হবে ৩০ মিনিটের দূরত্বে। মানে হলো চাইলে ৩০ মিনিটের মধ্যে আপনি দিল্লি-এনসিআর’এর যে কোনো জায়গায় পৌঁছে যেতে পারবেন। পুরো দিল্লি-এনসিআর যখন আপনার হাতের মুঠোয়, মানে ৩০ মিনিট দূরত্বে, তখন আপনি নিশ্চয়ই আর উচ্চ ব্যয়ে দিল্লির কেন্দ্রে থাকার জন্য ব্যাকুল হবেন না। পুরোনো দিল্লি, নয়াদিল্লি, গুরুগ্রাম, নয়ডা বা নতুন নমো সিটি- নাগরিকের তখন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকবে।
ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘসময়ের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোমির নামের আদ্যাক্ষর থেকে নতুন ধরনের, নতুন ধারণার শহর ‘নমো সিটি’র নামকরণ করা হয়েছে। নমো সিটি প্রচলিত ধারণার উপশহর নয়। নমো সিটি কোনো ঘুমানোর জায়গা হবে না। দিল্লিতে কাজ করে নমো সিটির বাসায় গিয়ে ঘুমাবো, এই ধারণা থেকে নাগরিকদের বের করে আনতে প্রত্যেকটি নমো সিটিকে গড়ে তোলা হবে একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর হিসেবে। প্রত্যেকটি নমো সিটিতে নিজস্ব শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, শপিং- সবকিছুর ব্যবস্থা থাকবে। নমো সিটিতে গড়ে তোলা হবে বড় বড় শিল্পকারখানা, আইটি পার্ক এবং সেবামূলক খাত, যাতে স্থানীয়ভাবেই লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। সব মিলিয়ে এমনভাবে গড়ে তোলা হবে, যাতে নমো সিটির বাসিন্দাদের কমসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা- কোনো কাজেই আর দিল্লিতে ছুটতে না হয়। কোনো পুরোনো শহরের পুনর্নিমাণ নয়, চারটি নমো সিটিই গড়ে তোলা হবে একদম নতুন করে।
একটি মেগাসিটির বিকাশের প্রাথমিক শর্ত হলো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। দিল্লি-এনসিআরকে ৩০ মিনিটের মধ্যে বেধে ফেলতে তাই আধুনিক, বহুমাত্রিক, দ্রুতগতির যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একটি স্মার্ট কানেক্টিভিটির আওতায় থাকবে দিল্লি-এনসিআর। এ পরিকল্পনায় নয়ডায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে, দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া রিজিওনাল র্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম বা ‘নমো ভারত’ ট্রেন নেটওয়ার্ককে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিদ্যমান মেট্রোলাইন এবং নমো ভারত ট্রেন নেটওয়ার্ককে একটি একক সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনা হচ্ছে। দিল্লি-এনসিআরজুড়ে এমন কিছু হাব বা কেন্দ্র তৈরি করা হবে, যেখানে নমো ভারত ট্রেন, মেট্রো, বাস পরিষেবা একসাথে মিলবে। ফলে এক বাহন থেকে অন্য বাহনে পরিবর্তনের সময় ও ভোগান্তি কমে আসবে। এই ট্রান্সপোর্ট হাবগুলোর আশপাশেই আবাসন, অফিস এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে যাতে মানুষের ভ্রমণের দূরত্ব ও সময় কমে যায়। সড়ক ও রেলের পাশাপাশি যানজট এড়াতে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট দ্রুত যোগাযোগের জন্য ‘হেলিকপ্টার ট্যাক্সি’ এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। রাস্তায় গাড়ির চাপ কমাতে এবং নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ বজায় রাখতে দিল্লির বিদ্যমান রিং রোডের সমান্তরাল একটি এলিভেটেড রিং রোড এবং সার্কুলার রিজিওনাল এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সুপারিশও রয়েছে মহাপরিকল্পনায়। এনসিআর ২০৪১-এ উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা এবং রাজস্থানের মতো এনসিআর রাজ্যগুলোর মধ্যকার সীমান্ত বা সীমানা বন্ধ না করার জন্য নীতিগত প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে প্রতিদিনের যাত্রীরা কোনো বাধা ছাড়াই যাতায়াত করতে পারেন।
নয়াদিল্লি, নয়ডা, গুরুগ্রামসহ বৃহত্তর দিল্লি তার সামর্থ্যের সীমা ছুয়ে ফেলেছে। এই সীমানা আর বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই মেট্রো এবং ট্রান্সপোর্ট হাবের আশপাশে ফ্লোর এরিয়া রেশিও বাড়িয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ভূমিতে নয়, দিল্লি হবে আকাশমুখী। একই এলাকায় বাসস্থান, কর্মক্ষেত্র এবং কেনাকাটার সুযোগ রাখা হবে।
গুরুগ্রাম বা নয়ডার মতো বড় শহরগুলোতে জমির দাম অনেক বেড়ে গেছে। তাই এই পরিকল্পনার আওতায় ফরিদাবাদ, দ্বারকা এবং গ্রেটার নয়ডা-র মতো এলাকাগুলোকে পরবর্তী প্রধান অর্থনৈতিক ও আবাসন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এই মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ২০ লাখ কোটি রুপির বিশাল বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাছাড়া এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে গড়ে উঠবে নতুন নতুন অর্থনৈতিক হাব, আবাসন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সবমিলিয়ে ভারতের অর্থনীতির জন্য গেমচেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে এনসিআর-২০৪১।
দিল্লি-এনসিআর হবে একটি একক, আন্তঃসংযুক্ত এবং আধুনিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের প্রাণকেন্দ্র। বাস্তবায়নের পথে ২০৩০ সালের মধ্যে দিল্লি-এনসিআর হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের বৃহত্তম মেগাসিটি। এই পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি আঞ্চলিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে। একই সাথে এটি একটি মডেল হয়ে উঠবে যে, কীভাবে দ্রুত নগরায়ণ হওয়া অঞ্চলগুলো যানজট, আবাসন সংকট এবং অবকাঠামোগত চাপ নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ার আগেই প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে পারে।
মোদ্দাকথা চারটি নমো সিটি, ৩০ মিনিটের এনসিআর, আর আকাশছোয়া ভবন- দিল্লি এনসিআর এমন একটি ভবিষ্যৎ, এমন একটি স্বপ্ন; যেখানে দিল্লিকে আর একা পুরো অঞ্চলের বোঝা বইতে হবে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিকল্পনাটি কাগজে-কলমে অসাধারণ হলেও এর আসল সাফল্য নির্ভর করবে আগামী ১৫ বছরে মাঠপর্যায়ে এর সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বদলে যাবে দিল্লির দিগন্ত।
বিডি প্রতিদিন/জেডএ