চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে গতকালের দিনটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বফুটবলের তারকাদের। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্লিং হালান্ডের পায়ের জাদুতে একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বিশ্বমঞ্চের এই রোমাঞ্চকর দিনে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, নরওয়ে এবং অস্ট্রিয়া স্বস্তির জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে।
দিনের শুরুতেই সেনেগালের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের দুর্দান্ত জয় দিয়ে মাঠ মাতায় ফ্রান্স। ২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সেনেগালের কাছে হেরে যাওয়ার সেই পুরনো ক্ষত এবার সুদে-আসলে পুষিয়ে নিল ফরাসীরা। ম্যাচে জোড়া গোল করে ইতিহাস গড়েন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই দুই গোলের মাধ্যমে তিনি কিংবদন্তি জুস্ত ফন্তেইনকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন। একই সাথে উয়েফা ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে মিশেল প্লাতিনিকে টপকে বড় টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলের কীর্তি এখন এই ফরোয়ার্ডের। ৩২ গজ দূর থেকে নেওয়া এক দর্শনীয় শটে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা গোলটি করার পাশাপাশি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে একাধিক গোল করার রেকর্ডেও এখন নারী ফুটবলের কিংবদন্তি মার্তার পাশে বসলেন এমবাপ্পে। অবশ্য এই ম্যাচেই সেনেগালের তরুণ তুর্কি ইব্রাহিম এমবায়ে গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে কনিষ্ঠতম আফ্রিকান গোলদাতার নতুন রেকর্ড গড়েছেন।
দিনের অন্য ম্যাচে ইরাককে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপে স্মরণীয় প্রত্যাবর্তন করেছে নরওয়ে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে খেলতে নেমে দলটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড নিজের অভিষেক ম্যাচেই করেছেন জোড়া গোল। এই দুই গোলের মাধ্যমে নরওয়ের ইতিহাসে বিশ্বকাপে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে গেছেন তিনি। নরওয়ের এই বড় জয়ের রাতে অবশ্য এশিয়ান পরাশক্তি ইরাকের হয়ে সান্ত্বনাসূচক গোলটি করেন আয়মেন হুসেইন। তবে একই ম্যাচে নিজেদের জালে বল জড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপে একই সাথে গোল এবং আত্মঘাতী গোল করার এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের তালিকায়ও নাম লিখিয়েছেন এই ইরাকি ফরোয়ার্ড।
তবে সব আলো যেন কেড়ে নিয়েছেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ ব্যবধানের সহজ জয়ে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১১তম হ্যাটট্রিকটি তুলে নেন তিনি। এই হ্যাটট্রিকের মধ্য দিয়ে কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছুঁয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড স্পর্শ করেছেন আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক। ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে এই কীর্তি গড়ে তিনি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে বয়োজ্যেষ্ঠ হ্যাটট্রিকধারী খেলোয়াড় হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা মেসি বিশ্বকাপে গোল এবং অ্যাসিস্ট মিলিয়ে পেলের সর্বোচ্চ অবদান রাখার রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এটি ছিল আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক, যার মাধ্যমে তিনি বিশ্বের চতুর্থ ভিন্ন মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থার দলের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন।
দিনের শেষ ম্যাচে জর্ডানের মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রিয়া। রোমাঞ্চকর এই লড়াইয়ে রালফ রাংনিকের শিষ্যরা ৩-১ ব্যবধানে জর্ডানকে পরাজিত করে। অস্ট্রিয়ার হয়ে রোমানো শমিড ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক দূরপাল্লার নিখুঁত শটে গোল করে দর্শকদের স্তব্ধ করে দেন। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম কোনো অস্ট্রিয়ান ফুটবলার বিশ্বকাপের মঞ্চে বক্সের বাইরে থেকে গোল করার কৃতিত্ব দেখালেন। এই হারের ম্যাচেও অবশ্য জর্ডানের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ গোলদাতার মর্যাদা পেয়েছেন আলী অলওয়ান। অন্যদিকে ৩৭ বছর বয়সে মাঠে নেমে অস্ট্রিয়ার ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার নতুন রেকর্ড গড়েন মার্কো আরনাউটোভিচ। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের এই দিনটি ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিয়েছে এক অবিস্মরণীয় গোল উৎসব এবং রেকর্ডের নতুন এক অধ্যায়।
সূত্র: ইএসপিএন
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ