কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে যেন পা ফেলার জায়গা নেই। ঈদুল ফিতর ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা অবকাশে পর্যটক-দর্শনার্থীতে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে সৈকত এলাকা। শনিবার (ঈদের দিন) রাত থেকেই পর্যটকের আগমন শুরু হয়েছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। চলতি ছুটিতে পর্যটন নগরীতে ৯ লাখের বেশি পর্যটক উপস্থিতির আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ সময়ে কয়েকশ কোটি টাকার বাণিজ্যের প্রত্যাশাও করা হচ্ছে।
সৈকতের লাইফগার্ড, বিচ কর্মী ও ট্যুরিস্ট পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঈদের দিন রাত থেকেই দলে দলে পর্যটক কক্সবাজারে আসছেন। পর্যটকবাহী বাসসহ বিভিন্ন পরিবহন, ইজিবাইক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাইপাস সড়ক, কলাতলী ডলফিন মোড়, হোটেল-মোটেল জোন, লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্ট সবখানেই উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে।
বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মাঠে টহল দিচ্ছেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কেপায়েত উল্লাহ বলেন, বিপুলসংখ্যক পর্যটক কক্সবাজারে এসেছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে পর্যটনস্পটগুলো সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে।
সপরিবারে সৈকতে এসেছেন ইব্রাহিম মুহাম্মদ। তিনি বলেন, রমজানের আগেই প্রবাস থেকে ফিরেছি। টানা ছুটিতে সবাইকে নিয়ে কক্সবাজারের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসে উঠেছি। পুরো হোটেল ও সৈকত পর্যটকে ভরা।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক রবিউল আলম জানান, ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে এখানে এসেছি। সৈকতের পরিবেশ খুব সুন্দর, তবে আজ মানুষের ভিড় অনেক বেশি। তবুও আনন্দটা উপভোগ করছি।
মোহাম্মদ সাব্বির নামে এক পর্যটক বলেন, এত মানুষ যে বসার সিট পাচ্ছি না। গরম থেকে বাঁচতে নোনাজলে গোসল করছি—পানি থেকে উঠতে মন চায় না।
সৈকতের চটপটি বিক্রেতা মো. সেলিম বলেন, এ সময়ে পর্যটক বেশি থাকায় বিক্রি অনেক ভালো হচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। আয়ও বেড়েছে।
কক্সবাজার ট্যুরস অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (টুয়াক) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। ফলে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় বাড়ছে। মৌসুমের শেষ সময়ে এমন উপস্থিতি আমাদের আশাবাদী করছে।
পর্যটন জোনের সি নাইট গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক শফিক ফরাজী বলেন, ঈদের ছুটিতে আগের মতোই পর্যটকের ভিড় বেড়েছে। হোটেল-মোটেলে প্রায় সব কক্ষ পূর্ণ।
লেইজার হোটেলিয়ার্স অব বাংলাদেশ, কক্সবাজার জোনের সভাপতি আবু তালেব শাহ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। ঈদের ছুটি ঘিরে কক্সবাজার পর্যটকে মুখরিত থাকবে—এটা আগে থেকেই ধারণা ছিল।
জেলা শহরের বাইরেও হিমছড়ি, দরিয়ানগর, ইনানী, মহেশখালী ও সাফারি পার্কসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটেও দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়েছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান জানান, অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ মাথায় রেখে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। র্যাব সদস্যরাও মাঠে রয়েছে।
এবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি টেকনাফ সমুদ্রসৈকতেও পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। বিভিন্ন পয়েন্টে ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়েছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, সৈকত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে টহল জোরদার রয়েছে।
ঈদের দিন থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সাড়ে ৪ লাখ মানুষ কক্সবাজারে এসেছেন বলে জানিয়েছেন হোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার। তিনি বলেন, ২৯ মার্চ পর্যন্ত টানা আট দিনে অন্তত ৯ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটতে পারে।
এদিকে সাগরে ঢেউয়ের মাত্রা বাড়ায় সমুদ্রস্নানে ঝুঁকি বেড়েছে। তাই নির্দেশনা মেনে সমুদ্রে নামার পরামর্শ দিচ্ছেন লাইফগার্ড কর্মীরা।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার ফিল্ড ম্যানেজার মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রায় দেড় মাসের নীরবতা ভেঙে কক্সবাজারে আবার পর্যটকের ঢল নেমেছে। মাত্র ২৭ জন কর্মী দিয়ে কলাতলী, লাবণী ও সুগন্ধা—এই তিনটি পয়েন্টে সেবা দেওয়া চ্যালেঞ্জিং। সবাই যদি লাইফগার্ডদের নির্দেশনা মেনে চলেন, তাহলে নিরাপদে সমুদ্রস্নান করা সম্ভব।
পর্যটকদের হয়রানি রোধে সৈকতের তিনটি পয়েন্টে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্র চালু রয়েছে। অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ঈদের ছুটিতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। হোটেলে অতিরিক্ত কক্ষভাড়া ও রেস্তোরাঁয় খাবারের মূল্য বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে।
বিডি-প্রতিদিন/মাইনুল