যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দেশের সংঘাত অবসানে একটি প্রাথমিক চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। আগামী শুক্রবার জেনেভায় সমঝোতা স্মারক সই হলে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে আরও বিস্তৃত চুক্তির পথ খুলতে পারে। এতে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে তৈরি হওয়া বড় সংকট কিছুটা কমার আশা দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আগে বিশ্ব অর্থনীতি যে অবস্থায় ছিল, সেখানে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে সৌর, বায়ু ও পারমাণবিক শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে অনেক দেশ।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এম্বারের বিশেষজ্ঞ ড্যান ওয়াল্টার বলেন, এটি একটি মস্ত বড় পরিবর্তন। পাঁচ বছর আগেও যে খাত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াই করছিল, এখন তা স্পষ্টতই অনেক বেশি সস্তা হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেক প্লাস জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও রাশিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। একই সময়ে ব্রাজিল, ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও গায়ানা তেল উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছে চীন। উইন্ড টারবাইন, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ট্রান্সফরমার ও অন্যান্য আধুনিক জ্বালানি প্রযুক্তি উৎপাদনে চীন ইতোমধ্যে অনেক এগিয়ে রয়েছে। উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের ভাষায়, চীন এই পরিস্থিতিতে একচেটিয়া বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আগের মতো নিরাপদ ও অবাধে জাহাজ চলাচল হবে কি না, তা নিয়ে এখন গভীর উদ্বেগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মরিস অবস্টফেল্ড বলেন, আমার মনে হয় না যে এই প্রণালিটি আর কখনোই আমাদের চিরচেনা অবাধ ও নিশ্চিত যাতায়াতের অবস্থায় ফিরে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যুদ্ধের সময় ইরানের হামলায় কাতারের গ্যাসক্ষেত্র, সৌদি আরবের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের আস্থাও নড়বড়ে হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, বছরের শুরুতে বৈশ্বিক অর্থনীতির অবস্থা আশাব্যঞ্জক ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২.৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যা ২০২৫ সালে ছিল ২.৯ শতাংশ।
এদিকে মূল্যস্ফীতিও আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর বদলে বাড়ানোর চিন্তা করছে। এতে ঋণনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো। যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব সামাল দিতে অনেক দেশ ইতোমধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে জরুরি ঋণ চেয়েছে।
ইন্দরমিত গিলের সতর্কবার্তা, বিশ্ব অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত আরও বেশি ভঙ্গুর ও অস্থির হয়ে উঠবে। তার মতে, এই অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
বিডিপ্রতিদিন/কেকে