একাত্তর-পরবর্তী সময়ে লুটপাটের শাসন ব্যবস্থা থেকে যিনি বাংলাদেশকে উন্নয়নের ধারায় নিয়ে এসেছিলেন তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। একজন সাধারণ সৈনিক থেকে দেশপ্রেমের দীক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। সেই দীক্ষাই তাকে দেশ ও জাতি গঠনের কাজে বাধিত করে। তিনি হয়ে ওঠেন অগ্রসরমান বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। উন্নয়ন, উৎপাদন আর উন্নত জাতিসত্তা বিনির্মাণের প্রাণপুরুষ। তাইতো যতদিন এই ভূখণ্ড রবে ততদিন এই জাতির মনের মণিকোঠায় রয়ে যাবেন বাংলার রাখাল রাজা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জিয়াউর রহমান দ্বিতীয়। ১৯৫২ সালে তিনি করাচি একাডেমি স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি করাচিতে ডি. জে কলেজে ভর্তি হন। একই বছর তিনি কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সালে সামরিক বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। করাচিতে দু’বছর চাকরি করার পর ১৯৫৭ সালে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। এছাড়াও তিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে অসীম সাহসিকতার জন্য বীরত্বসূচক পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ইনস্ট্রাক্টর পদে নিয়োগ লাভ করেন। একই বছর তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটার স্টাফ কলেজে কমান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি মেজর পদে পদোন্নতি পেয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জয়দেবপুরে সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গভীর রাতে পূর্ব পাকিস্তানের ঘুমন্ত, নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে হত্যা ও মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি শুরু করলে জিয়া দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্ত্রী-সন্তানদের জীবন বিপন্ন হতে পারে জানা সত্ত্বেও জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করার জন্য নিজ নামে জেড ফোর্স গঠন করেন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে ১নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়। লাল-সবুজের পতাকায় শোভিত স্বাধীন দেশে তিনি পুনরায় সেনাবাহিনীতে ফিরে যান। ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে তিনি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য শেখ মুজিবের সরকার জিয়াউর রহমানকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পট পরিবর্তন ঘটে। ক্যু ও পাল্টা ক্যু’র মাধ্যমে দেশ যখন চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সংকটে নিপতিত তখন জিয়াউর রহমান আবার দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লব ও সংহতির মধ্য দিয়ে তিনি গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রশ্নাতীত জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা তাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পাদপীঠে আসীন করে।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপরের ইতিহাস বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। তিনি প্রথমেই মুজিবের বাকশাল থেকে জাতিকে মুক্তি দেন। সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল প্রথা বাতিল করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করলে জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে শুরু করে। গণমাধ্যমের ওপর থেকে সকল কালাকানুন প্রত্যাহার করেন। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে দেশে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট পুরস্কার চালু, অনুদান তহবিল গঠন, ফিল্ম ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং চলচ্চিত্রে প্রেসিডেন্ট পুরস্কারের সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ বছরই তিনি জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ এবং এর সাথে স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণ বিভাগ যুক্ত করেন।
পরে বায়ান্নের ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৬ সালে তিনি প্রবর্তন করেন একুশে পদক। এছাড়া গুণী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তাদের কাজের স্বীকৃতি ও সম্মান জানাতে ১৯৭৭ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রবর্তন করেন। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে পুরোনো হাইকোর্ট ভবনের পশ্চিম পাশে তিনি শিশু একাডেমির নতুন ভবন উদ্বোধন করেন। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কলেরা হাসপাতাল। পাশাপাশি ১৯৮১ সালে ঢাকার মহাখালীতে নার্সিং কলেজ এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। তারই পৃষ্ঠপোষকতায় নিপসম, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান ও ইপিআই প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ৫০ শয্যার ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, পিজি হাসপাতালের সি-ব্লক, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ চিকিৎসকদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান বিএমএ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বাংলাদেশি জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমির উন্নয়নে বাংলা একাডেমি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮ জারি করেন।
জিয়াউর রহমান জানতেন বাংলাদেশকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে আগে কৃষিকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তাই তিনি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে খাল খনন কর্মসূচির প্রবর্তন করেন। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের উলশী-যদুনাথপুর খাল খননের মাধ্যমে খাল খনন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তিনি। এরপর ১৯৭৭ সালের ২২ মে জিয়াউর রহমান আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বাংলাদেশের ম্যাগনাকার্টা বা মুক্তির সনদ ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
এছাড়া তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তন করেন। তার আগ্রহেই ১৯৮১ সালের মার্চ-এপ্রিলে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালে ৪টি বিভাগীয় শহরে ইসলামী সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। শিশুদের বিনোদনের জন্য ১৯৭৯ সালে রাজধানীর শাহবাগে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় শিশু পার্ক। শিশুর স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য শ্যামলীতে একটি শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৬ সালে শিশুদের সাংস্কৃতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করতে পুনরায় বিটিভিতে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা চালু করেন।
১৯৮০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয়ভাবে নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সার্ক প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা পালন করেন তিনি। দেশে সকল ধর্মের মানুষের স্বীয় ধর্ম পালনের সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। পল্লী চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং প্রথম বছরেই ২৭ হাজার লোককে পল্লী চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালের ১৯ জানুয়ারি দেশের মেধাবী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বরেণ্য ব্যক্তিদের একটি বহর নিয়ে তার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম থেকে গভীর সমুদ্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে হিজবুল বাহার। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি ধারণা সৃষ্টি হয়। তিনি বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যুতের আলো সারাদেশে পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। তিনি জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করেন।
এছাড়া তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা করে কেবল নিজে নয়, বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি করান। পাশাপাশি আঞ্চলিক যোগাযোগ কূটনীতিতে তার উদ্যোগে গড়া সার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ লাভ করে। এমন অসংখ্য উদ্যোগ নিয়ে তিনি একটি নবীন দেশকে উন্নয়নের মূল স্রোতে তুলে দেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাত। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সৈনিকের বুলেটের আঘাতে শহীদ হন আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পৃথিবীর ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রমী ব্যক্তি। যিনি এত কম সময়ে একটি দেশের আমূল পরিবর্তন করেছিলেন। আজ তার ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। বিশেষ এই দিনে তার প্রতি রইল অফুরন্ত শ্রদ্ধা ও হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা।
লেখক: মহাসচিব, ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)।