প্রস্তাবিত বড় আকারের বাজেটকে ঘিরে অর্থনৈতিক মহলে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও অর্থায়নের উৎসকে কেন্দ্র করে। এই বাজেটের কাঠামো কাগজে-কলমে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও বাস্তব অর্থনীতির সক্ষমতার সঙ্গে এর ব্যবধান স্পষ্ট।
বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আয়। গত কয়েক বছরে রাজস্ব সংগ্রহ যেখানে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার নিচেই থেকে গেছে, সেখানে এক লাফে বড় অঙ্কের লক্ষ্য নির্ধারণ অবাস্তব। করজালের সীমাবদ্ধতা, কর ফাঁকি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি এরই মধ্যে বড় আকার ধারণ করেছে।
ঘাটতি অর্থায়নের জন্য দেশীয় উৎসর পাশাপাশি বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। ফলে অর্থায়নের উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বড় অঙ্কের উন্নয়ন বরাদ্দ থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং সমন্বয়ের অভাবে পুরো অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না। ফলে পরিকল্পনার বড় অংশ কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এ ছাড়া দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, সুদের হার বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বন্দর, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যা শিল্প খাতকে আরো চাপে ফেলছে।
তাই এই ধরনের উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে তা উল্টো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়তে পারে এবং সামগ্রিকভাবে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে বাজেটকে সফল করতে হলে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ নয়, বরং বাস্তবসম্মত রাজস্ব কৌশল, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার জরুরি। না হলে বড় বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
লেখক : বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।