শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকীর দিনটি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক গভীর বেদনাবিধুর, আত্মসমীক্ষা এবং এক অপূরণীয় রাজনৈতিক ক্ষতির দিন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে শুধু একজন রাষ্ট্রপতির শাহাদত দিবস নয়; এটি এমন একজন রাষ্ট্রনায়কের মহাপ্রয়াণের দিন; যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত, রাজনৈতিক অস্থিরতায় আক্রান্ত, অর্থনৈতিকভাবে ধসে পড়া সংকটাপন্ন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সৈনিক, একজন সংগঠক, একজন রাষ্ট্রনায়ক এবং সর্বোপরি জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনকারী এক ব্যতিক্রমী নেতা। তাঁর জীবন, কর্ম ও শাহাদত বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে যা আজও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনসম্পৃক্ত উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রের মর্যাদাশীল অবস্থানের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রকে একটি স্থিতিশীল, কার্যকর ও গণতান্ত্রিক কাঠামোয় উন্নীত করাই ছিল সবচেয়ে বড় কঠিন কাজ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, খাদ্যসংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতার আবর্তে নবীন রাষ্ট্রটি কঠিন পরীক্ষার মুখে অবতীর্ণ হয়। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষমতা এককেন্দ্রীকরণ, স্বাধীন মতপ্রকাশে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাকে ক্রমশ সংকুচিত করতে থাকে। ইতিহাসের এই অগ্নিগর্ভ সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যখন জনগণ ছিল অনিশ্চয়তায় তাড়িত, রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল দুর্বল এবং আস্থার সংকটে ধুঁকছিল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন, যেখানে জাতীয়তাবাদ, উৎপাদন, উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা, জনগণের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্রের স্বাধীন মর্যাদা প্রমুখ বিষয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দর্শন নির্মিত হয়। তাঁর রাজনীতি কোনো সংকীর্ণ গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতি ছিল না, বরং তিনি সমাজের নানা শ্রেণি, পেশা ও মতের মানুষকে রাষ্ট্র নির্মাণের অংশীদার হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি জনগণকে আবার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনেন। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে যে গণতান্ত্রিক ধারা শুরু হয়, সেটি শুধু সাংবিধানিক বা নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি রাজনীতিকে জনগণের জীবনযাত্রার দৈনন্দিনতার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল মানুষের খাদ্য, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিক্ষা, উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং আত্মমর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বাস্তবধর্মী প্রক্রিয়া। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র যদি জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো কখনোই পূর্ণতা পায় না।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তায় উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদ ছিল একে অপরের পরিপূরক। তিনি খাদ্য উৎপাদনকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে নিরূপণ করেছিলেন। গ্রামীণ উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী করার উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে তিনি শুধু নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখেননি, বরং রাষ্ট্রকে কার্যকর করার উপায় হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর রাজনীতির মূল সূত্র ছিল—রাষ্ট্র জনগণের জন্য, জনগণ রাষ্ট্রের শক্তি, আর জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন একটি অসম্ভব বিষয়। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতিতে আত্মসমর্পণের ভীরুতা ছিল না, আবার অযৌক্তিক সংঘাতের প্রবণতাও তিনি ধারণ করেননি। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশ আত্মমর্যাদার সঙ্গে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখুক, বাস্তবতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বের মেলবন্ধন গড়ুক এবং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সুসংহত করুক। আজকের জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর এই চিন্তা আরও অধিকতর প্রাসঙ্গিক। কারণ একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা কেবলমাত্র ভৌগোলিক সীমান্তের নিরিখে রচিত হয় না, বরং সেটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার মেলবন্ধনে নিহিত।
তাঁর শাহাদত বাংলাদেশের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর মতো একজন রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বিশেষ করে যখন কিনা তিনি রাষ্ট্রনির্মাণের একটি চলমান প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তাঁর শাহাদত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার ওপর গভীর আঘাত হানে, কেননা রাষ্ট্রকে তিনি স্থিতিশীলতা, উৎপাদনশীলতা, মুক্ত গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ সেই ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। জিয়াউর রহমানের জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণ তাঁর জনপ্রিয়তা ও জনগণের তাঁর প্রতি ভালোবাসার এক ঐতিহাসিক প্রকাশ। দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এগিয়ে আসে। একজন নেতার প্রকৃত মূল্যায়ন অনেক সময় তাঁর মৃত্যুর পর জনগণের শ্রদ্ধানিবেদন ও হাহাকারের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়। ক্ষমতার আসন, রাষ্ট্রের পদমর্যাদা বা আনুষ্ঠানিক সম্মান দিয়ে মানুষের ভালোবাসা তৈরি করা যায় না। মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে হয় সততা, কর্ম, সাহস, ন্যায়পরায়ণতা এবং জনগণের পাশে থাকার মাধ্যমে। জিয়াউর রহমান সেই স্থান খুব সফলভাবেই অর্জন করেছিলেন।
তাঁর নামাজে জানাজায় উপস্থিত জনসমুদ্র প্রমাণ করে যে তিনি মাত্র রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; তিনি জনমানুষের নেতা ছিলেন। তাঁর প্রতি মানুষের আকর্ষণ শুধু ক্ষমতার কারণে ছিল না, ছিল আস্থার কারণে। সাধারণ মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করেছিল একজন সৎ, সরল, কর্মঠ ও দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। তিনি বিলাসী জীবনযাপন করতেন না; তিনি মাঠকেন্দ্রিক, কর্মমুখী ও জনগণঘনিষ্ঠ নেতা ছিলেন। এসব কারণেই তাঁর মৃত্যু সাধারণ মানুষের নিকট ছিল স্বজন হারানোর শোকের মতো। একজন সৎ রাষ্ট্রনায়ক ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তর করেন না; ক্ষমতাকে তিনি জাতির সেবার দায়িত্ব প্রতিপালনের সুযোগ বলে বিবেচনা করেন। জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ববোধ সুস্পষ্ট ছিল। তিনি রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত আনুগত্যের ওপর দাঁড় করাতে চাননি; তিনি রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠান, শৃঙ্খলা, উৎপাদন এবং জনগণের অংশগ্রহণের ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। তাঁর ন্যায়পরায়ণতার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল রাষ্ট্রের ভেতরে ভারসাম্য তৈরির, সমাজের নানা অংশকে অন্তর্ভুক্ত করার এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করার প্রয়াস।
তিনি কর্মীবান্ধব নেতা ছিলেন, কারণ তিনি মাঠকর্মীর গুরুত্ব বুঝতেন। তিনি জানতেন কোনো রাজনৈতিক আদর্শ শুধু শীর্ষ নেতৃত্ব দিয়ে টিকে থাকে না; আদর্শ টিকে থাকে কর্মীদের শ্রম, ত্যাগ ও বিশ্বাসের ওপর। আবার তিনি শুধু দলীয় কর্মীদের কথা ভাবেননি; তিনি কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, সৈনিক, সরকারি কর্মকর্তা—সবাইকে রাষ্ট্রনির্মাণের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর রাজনীতিকে বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দিয়েছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মহাপ্রয়াণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর কর্মধারা এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও প্রবহমান। তিনি বাংলাদেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন, জনগণকেন্দ্রিক রাজনীতির ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, রাষ্ট্রকে উৎপাদনমুখী ও আত্মনির্ভর করার ডাক দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি বাংলাদেশের মর্যাদাশীল অবস্থানের কথা ভেবেছিলেন এবং জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তাকে সুসংহত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর শাহাদত প্রমাণ করে যে সত্যিকারের নেতৃত্ব কখনো শুধু জীবদ্দশায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন নেতা যদি জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারেন, তবে তাঁর শাহাদত তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয় না; বরং তাঁকে জাতিসত্তার সাথে আরও গভীরভাবে প্রোথিত করে। জিয়াউর রহমান সেই বিরল রাষ্ট্রনায়কদের একজন, যিনি মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচিন্তায় সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক।
১৯৮১ সালের ৩০ মে তাই আমাদের কাছে কেবল শোকের দিন নয়; বরং এটি অঙ্গীকারের দিন। গণতন্ত্রের পক্ষে অঙ্গীকার, জনগণের রাজনীতির পক্ষে অঙ্গীকার, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার, সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের পক্ষে অঙ্গীকার। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন ও শাহাদত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ, গণতন্ত্রের প্রকৃত ভিত্তি বহুমত, উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি উৎপাদন, আর নেতৃত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য সততা ও কর্ম। বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জাতীয় মর্যাদার ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর শাহাদত জাতির জন্য বেদনাবিধুর হলেও, তাঁর জাতীয়তাবাদের উত্তরাধিকার জাতির জন্য প্রেরণা। তিনি ছিলেন সত্যিকারের সৎ, ন্যায়পরায়ণ, কর্মীবান্ধব ও জনগণমুখী রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর মহাপ্রয়াণ তাই শেষ নয়, বরং একটি অমর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রবহমানতা, যা কিনা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলাদেশকে গণতন্ত্র, জাতীয় স্বার্থ, আত্মনির্ভরতা ও জনগণের মর্যাদার পথে এগিয়ে যেতে সর্বদা অনুপ্রাণিত করবে।
লেখক: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা