বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিল্প ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা। দেশের অর্থনীতির বর্তমান আকার প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার হলেও এর বিপরীতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন অর্থবছরের বাজেটে শিল্প খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল শক্তি এখনো উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর শিল্প খাত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট খাত লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় শিল্প বড় চাপের মুখে পড়েছে। গত পাঁচ বছরে সুতা আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের স্থানীয় শিল্পে। দেশীয় উৎপাদন কমছে, অনেক কারখানা সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের একটি অংশ বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এতে শুধু শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি পুরনো শিল্পকে শক্তিশালী করতে সহজ ও কার্যকর অর্থায়ন প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যাংক খাত নিজেই এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক শিল্পে নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী।
অন্যদিকে সরকার যদি বাজেট ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্তভাবে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ আরো সংকুচিত হবে। এতে স্থানীয় বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই অর্থায়নের বিকল্প উৎস নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। পুঁজিবাজারকে কার্যকর করা, বিদেশি ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তার সঠিক ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে এমন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যা সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং মানুষের আয় বাড়ায়। কারণ অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি আসে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা থেকে।
জ্বালানি দক্ষতাকেও এখন বড় গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতি যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী লাইট, ইনভার্টার, আধুনিক মোটর এবং ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে নীতি সহায়তা দিলে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
সব মিলিয়ে এবারের বাজেট শুধু ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি হওয়া উচিত শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষার বাস্তব পরিকল্পনা। বিদ্যমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে না পারলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোশিয়েশন (বিটিএমএ)।
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ