বাজেট ২০২৬-২৭:

ই-কমার্স খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩০ প্রস্তাবনা

ই-কমার্স খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩০ প্রস্তাবনা
৭ জুন, ২০২৬ ০০:৪৫  
৮ জুন, ২০২৬ ০৯:৫২  

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ই-কমার্স। বর্তমানে এই খাতের বাজারের আকার প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা, যা প্রত্যক্ষভাবে ৫ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ২০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বিদ্যমান অর্থ আইন ও আয়কর আইনের কিছু জটিলতা এবং উচ্চ কর হারের কারণে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, বিশেষত নারী উদ্যোক্তারা বর্তমানে অস্তিত্ব রক্ষার চরম সংকটে পড়েছেন। সঠিক নীতিসহায়তা ও কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ নিশ্চিত করা গেলে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত দেশের জিডিপিতে ৫%-এর বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবে। 

অথচ বিদ্যমান অর্থ ও আয়কর আইনের কিছু জটিলতা এবং উচ্চ কর হারের কারণে এই খাতের উদ্যোক্তারা, বিশেষত নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় স্বার্থে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই 'স্মার্ট ইকোনমি' বিনির্মাণের ৬ দফায় আমার ৩০টি প্রস্তাবনা বিবেচনায় নিতে পারেন সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহল। 

কর ও আইনি কাঠামো সংস্কার

  • ITES অন্তর্ভুক্তিকরণ: অর্থ আইন ২০১৬ (৫৪-গ) সংশোধনপূর্বক ই-কমার্সকে পুনরায় 'তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক সেবা' (ITES) ভুক্ত করতে হবে এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি প্রদান করতে হবে। এটি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি করবে।

  • ন্যূনতম কর যৌক্তিকীকরণ: স্টার্টআপদের টিকে থাকার হার বাড়াতে লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর (আয়কর আইন ২০২৩, ধারা ১৬৩) ০.১%-এ সীমাবদ্ধ রাখা প্রয়োজন।

  • প্রচারণামূলক ব্যয় সীমা বৃদ্ধি: ব্র্যান্ডিং ও বাজার সম্প্রসারণে বিজ্ঞাপনের ব্যয়সীমা টার্নওভারের ০.৫% থেকে বাড়িয়ে ৫% করার প্রস্তাব করছি।

  • প্রশাসনিক হয়রানি হ্রাস: ভাড়ার বিপরীতে বাড়িওয়ালার রিটার্ন কপি জমার বাধ্যবাধকতা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিথিল করতে হবে।

  • সহজ রিটার্ন ও লাইসেন্সিং: এনবিআর-এর জন্য এক পাতার (Single Page) সহজ রিটার্ন ফর্ম এবং দেশব্যাপী সর্বোচ্চ ১,০০০ টাকা ফিতে অভিন্ন 'ই-কমার্স ট্রেড লাইসেন্স' চালু করতে হবে।

ক্যাশলেস ইকোনমি ও ডিজিটাল ট্রানজেকশন

  • ভ্যাট রেয়াত ও ক্যাশব্যাক: ক্যাশলেস লেনদেনকে উৎসাহিত করতে ডিজিটাল পেমেন্টে ৩%-৫% ভ্যাট রেয়াত বা ক্যাশব্যাক সুবিধা প্রদান করতে হবে।

  • গেটওয়ে চার্জ সমন্বয়: পেমেন্ট গেটওয়ের উচ্চ চার্জ (১.৫%-৩%) কমাতে সরকার কর্তৃক ১.৫% ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ফরমাল চ্যানেলে আনতে হবে।

  • অটোমেশন ও রিফান্ড: পেমেন্ট রিফান্ড প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অটোমেটেড করা এবং রিফান্ড ব্যাংক চার্জ সম্পূর্ণ মওকুফ নিশ্চিত করতে হবে।

নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সুরক্ষা

  • নারী উদ্যোক্তাদের কর সুবিধা: বার্ষিক ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার থাকা নারী উদ্যোক্তাদের সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখতে হবে।

  • DBID-এর কার্যকারিতা: ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন (DBID) থাকলেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক লোনের সুযোগ ও আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।

  • জামানতবিহীন স্মার্ট লোন: ডিজিটাল ট্রানজেকশন রেকর্ডের ভিত্তিতে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ৫-১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

লজিস্টিকস ও অবকাঠামো উন্নয়ন

  • শুল্কমুক্ত যন্ত্রপাতি: লজিস্টিকস সর্টিং ও অটোমেশন যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক শূন্য করতে হবে।

  • ভ্যাট প্রত্যাহার/হ্রাস: ডেলিভারি চার্জের ওপর বিদ্যমান ১৫% ভ্যাট প্রত্যাহার এবং ই-কমার্স হাবের ভাড়ার ওপর ভ্যাট মওকুফ করতে হবে।

  • ই-কমার্স ভিলেজ: ঢাকার ওপর চাপ কমাতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে 'ই-কমার্স ভিলেজ' গঠন করতে হবে।

  • সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা: প্রজ্ঞাপন (SRO ২৪০-আইন/২০২১) অনুযায়ী অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের ওপর জোগানদার হিসেবে উৎস কর কাটা বন্ধ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কৃষি পণ্য

  • রপ্তানি প্রণোদনা: ই-কমার্স রপ্তানিতে ১০-১৫% নগদ প্রণোদনা ও সহজ শুল্কায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

  • বন্ডেড ওয়্যারহাউস: রপ্তানিমুখী ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রদান করতে হবে।

  • ডাক বিভাগে ভর্তুকি: আন্তর্জাতিক ডেলিভারির খরচ কমাতে ডাকযোগে পণ্য প্রেরণে ৫০% সরকারি ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।

  • পেমেন্ট শিথিলতা: ১,০০০ ডলার পর্যন্ত আন্তর্জাতিক লেনদেনে পাসপোর্ট কপির বাধ্যবাধকতা রহিত করতে হবে।

  • এগ্রি-ই-কমার্স: কৃষিপণ্য উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও কোল্ড চেইন সাবসিডি প্রদান করতে হবে।

  • পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং: পাটজাত ও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহারে বিশেষ ভ্যাট ছাড় দিতে হবে।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি

  • বিজ্ঞাপন ভ্যাট হ্রাস: দেশীয় প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ভ্যাট ১৫% থেকে কমিয়ে ৫% করতে হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে।

  • রিস্ক ফান্ড ও বিমা: সাইবার আক্রমণ ও ব্যবসায়িক বিপর্যয় মোকাবিলায় 'ডিজিটাল কমার্স রিস্ক ফান্ড' গঠন ও সাশ্রয়ী 'সাইবার ইনস্যুরেন্স' চালু করতে হবে।

  • ইনোভেশন ও দক্ষতা: কারিকুলামে 'ডিজিটাল কমার্স ম্যানেজমেন্ট' অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ইনোভেশন ও গবেষণার জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে।

আমার বিশ্বাস, প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে তা কেবল ই-কমার্স খাতের টিকে থাকা নিশ্চিত করবে না, বরং একটি শক্তিশালী 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।


লেখকঃ ই-কমার্স বিশ্লেষক ও ফাউন্ডিং মেম্বার, ই-ক্যাব 


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।