রূপপুরে কারিগরি ত্রুটির গুজব বাস্তবতাবিবর্জিত, পরীক্ষা নিরাপত্তা ব্যবস্থারই অংশ: এনপিসিবিএল

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে একটি কারিগরি বিচ্যুতি (Deviation) শনাক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে ছড়ানো গুজবকে ভিত্তিহীন বলেছে এনপিসিবিএল। এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে নিয়মিত 'লিক-টাইটনেস টেস্ট' চলাকালে এই ক্ষুদ্র বিচ্যুতি ধরা পড়ে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতারই প্রমাণ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, কেন্দ্রটিকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল করতে ১ বিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা বিনিয়োগ

রূপপুরে কারিগরি ত্রুটির গুজব বাস্তবতাবিবর্জিত, পরীক্ষা নিরাপত্তা ব্যবস্থারই অংশ: এনপিসিবিএল
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:৪৩  

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম (কমিশনিং) চলাকালে একটি সাধারণ কারিগরি বিচ্যুতি বা ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। তবে এটি নিয়ে কোনো ধরনের আতঙ্কিত বা বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই বলে জানিয়েছে কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে যে, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে এ ধরনের ক্ষুদ্র ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধন করা যেকোনো পারমাণবিক প্রকল্পের কমিশনিং প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং বাধ্যতামূলক অংশ।

‘কার্যক্রম শুরুর আগেই গুরুতর কারিগরি ত্রুটির কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে’—সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে এমন কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর পর জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই অপপ্রচারকে সম্পূর্ণ বাস্তবতাবিবর্জিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান।

১৫ জুন,  সোমবার বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে ড. জাহেদুল হাসান বলেন, "নিরাপত্তাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। কিছু মহলের প্রচারিত বিকৃত তথ্য অযথা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, যার সঙ্গে প্রকৃত পরিস্থিতির কোনো মিল নেই।" তিনি জানান, কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) কঠোর তত্ত্বাবধানে একাধিক নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। এসব পরীক্ষায় সামান্য বিচ্যুতি শনাক্ত হওয়া বরং কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতারই বড় প্রমাণ।

কারিগরি বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রের সেকেন্ডারি সার্কিটে ৮.১ মেগাপাস্কাল (MPa) চাপে পরিচালিত ‘লিক-টাইটনেস টেস্ট’ একটি বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত পরীক্ষা। প্রতিবার কেন্দ্র যখন শাটডাউন অবস্থা থেকে অপারেশনাল অবস্থায় যায়, তখন এই পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্পে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রচলিত প্রক্রিয়া। এই পরীক্ষার সময়ই নির্ধারিত গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ডের তুলনায় একটি কারিগরি বিচ্যুতি (Deviation) শনাক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানের কঠোর নিরাপত্তা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ক্ষুদ্রতম বিচ্যুতিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া কোনো কাজেরই অনুমোদন দেওয়া হয় না।


এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরমাণু বিজ্ঞানী শফিকুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি লোডিং বা কমিশনিং পর্যায়ে এ ধরনের ক্ষুদ্র কারিগরি বিষয় শনাক্ত হওয়া একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে প্ল্যান্ট সম্পূর্ণ শাটডাউন করতে হয়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই সে ধরনের নয়। তাই এটিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের কোনো কারণ নেই।


এদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারকে আশ্বস্ত করে বলেন, "বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। রূপপুর প্রকল্পকে ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সুনামির মতো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে গড়ে তুলতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগ করা হয়েছে।" তিনি আরও জানান, এই প্রথম প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের ওপর ভিত্তি করে রূপপুরে ভবিষ্যতে আরও দুটি নতুন ইউনিট স্থাপনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি অত্যন্ত সাশ্রয়ী হবে।

প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতির তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রথম ইউনিটে গত ২৮ এপ্রিল সফলভাবে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে কমিশনিং কার্যক্রম চলছে। একই সাথে দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ ও প্রস্তুতিমূলক কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।


নতুন সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হবে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে দুটি ইউনিট থেকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

//ডিবিটেক/এশএআর/ইকে//