বিজ্ঞান হলো প্রশ্ন করার সাহস
- বিজ্ঞান মেলা বা অলিম্পিয়াড কেবল কোনো প্রতিযোগিতা নয়, এটি মূলত প্রশ্ন করার উৎসব। বড় হওয়ার সাথে সাথে আমাদের প্রশ্ন করার অভ্যাস হারিয়ে ফেলা উচিত নয়, কারণ প্রতিটি আবিষ্কারের সূচনা হয় একটি সাধারণ ‘কেন’ থেকে।
হতাশা আমাদের জীবনের সারথি। তোমরা যারা বিজ্ঞানী বা গবেষক হতে চাও, খালি হতাশা আর হতাশা। টাকা নেই, লোকজন দাম দিচ্ছে না, অনেক চেষ্টা করেও হচ্ছে না, উত্তর মিলছে না, সমাধান হচ্ছে না, ঘুম হচ্ছে না, ঘুম হলে সকাল বেলা উঠতে বিরক্তি লাগছে, সবার সাথে খারাপ ব্যবহার, তোমরা আমাকে বুঝো না। এইসবের নাম বিজ্ঞানী হওয়া। এইগুলা তোমাদের গলার মালা।
আজকের এই আয়োজন শুধু একটি বিজ্ঞান মেলা নয়, শুধু একটি অলিম্পিয়াড নয়, শুধু একটি কুইজ প্রতিযোগিতাও নয়। আজকের এই আয়োজন আসলে প্রশ্ন করার উৎসব।
আমরা ছোটবেলায় কত প্রশ্ন করতাম, মনে আছে? আকাশ নীল কেন? বৃষ্টি হয় কীভাবে? পাখি উড়ে কিন্তু মানুষ কেন উড়তে পারে না? গাছের পাতা সবুজ কেন?
দুঃখের বিষয় হলো, বড় হতে হতে আমরা অনেকেই প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিই। অথচ বিজ্ঞান শুরুই হয় একটি প্রশ্ন থেকে।
আইজ্যাক নিউটন আপেল পড়তে দেখেছিলেন। আপেল তো সবাই দেখেছে। কিন্তু নিউটন প্রশ্ন করেছিলেন—আপেলটা নিচেই পড়ল কেন? ওপরে গেল না কেন?
এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছিল মহাকর্ষের ধারণা।
তাই আমি আজ তোমাদের কাছে একটি অনুরোধ করব—প্রশ্ন করতে কখনো ভয় পেও না।
শুধু বইয়ের উত্তর মুখস্থ করার জন্য বিজ্ঞান শেখো না। বিজ্ঞান শেখো পৃথিবীকে বোঝার জন্য। কেন নদী দূষিত হয়, কীভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়, কীভাবে প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরি করা যায়, কীভাবে কৃষকের জীবন সহজ করা যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই বিজ্ঞান।
অনেকেই মনে করে বিজ্ঞান মানে শুধু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। আমি তা মনে করি না।
বিজ্ঞান আসলে একটি চিন্তার পদ্ধতি। বিজ্ঞান আমাদের শেখায়—
প্রমাণ ছাড়া কিছু বিশ্বাস না করতে,
ভুল হলে তা স্বীকার করতে,
নতুন তথ্য পেলে মত পরিবর্তন করতে,
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সমস্যার সমাধান খুঁজতে।
আজ যারা বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিচ্ছো, মনে রেখো—তোমাদের প্রকল্প প্রথম না-ও হতে পারে। অলিম্পিয়াডে তোমরা হয়তো স্বর্ণপদক নাও পেতে পারো। কুইজে হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর জানা নাও থাকতে পারে।
কিন্তু সেটি কখনো ব্যর্থতা নয়।
কারণ আজ তোমরা অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিখছো— কীভাবে ভাবতে হয়, কীভাবে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে হয়, কীভাবে উপস্থাপন করতে হয়, এবং কীভাবে বারবার চেষ্টা করতে হয়।
আমার নিজের জীবনেও এমন অনেক সময় এসেছে, যখন কোনো পরীক্ষা সফল হয়নি, কোনো গবেষণা প্রত্যাশামতো ফল দেয়নি। কিন্তু আমি দেখেছি, বিজ্ঞান আমাদের একটি জিনিস শেখায়—আবার চেষ্টা করতে। লেগে থাকার নামই বিজ্ঞান। ঘুম থেকে উঠতে শরীর টানে না, তারপরও উঠতে হয়, আবার লেগে থাকতে হয়, এর নামই বিজ্ঞান।
প্রিয় শিক্ষার্থীরা, তোমাদের মধ্যে হয়তো ভবিষ্যতের কোনো বিজ্ঞানী বসে আছে। হয়তো কেউ নতুন ওষুধ আবিষ্কার করবে। কেউ জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খুঁজবে। কেউ এমন প্রযুক্তি তৈরি করবে যা মানুষের জীবনকে সহজ করবে।
আবার এটাও হতে পারে যে তোমাদের কেউ বিজ্ঞানী হবে না। কিন্তু তবুও এই বিজ্ঞান মেলা তোমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তোমরা যাই হও না কেন—একজন শিক্ষক, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ, প্রশাসক বা শিল্পী—বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা তোমাদের আরও ভালো মানুষ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হতে সাহায্য করবে।
আজকের পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জিন প্রযুক্তি—সবকিছু আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। আর সেই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে তোমরাই।
তাই স্বপ্ন দেখো।
প্রশ্ন করো।
পরীক্ষা করো।
ভুল করো।
আবার শিখো।
আর কখনো কৌতূহল হারিয়ে ফেলো না।
আর আশে পাশের নিজস্ব প্রবলেম সলভ করো। কেনো মশা কমানো যাচ্ছে না। কেনো হামে বাচ্চা মারা যাচ্ছে, কোনো early indicator বের করা যায় কিনা, কেনো অটো রিকশাগুলো এতো অনিরাপদ, কিভাবে পোল্ট্রি ফিডকে নিরাপদ করা যায়, ময়লা আবর্জনাকে কীভাবে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় mindset is important.
শেষে শুধু একটি কথাই বলতে চাই— "বিজ্ঞান শুধু উত্তর খোঁজার বিষয় নয়; বিজ্ঞান হলো প্রশ্ন করার সাহস। আর যে প্রশ্ন করতে শেখে, সে-ই একদিন পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে।"
জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর সম্মাননা গ্রহণের পর উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এই অভিভাষণ দেন ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়ক বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)-এর ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার থেকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপের অধীনে টেক্সটাইল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে অস্ট্রেলিয়ান ডেভেলপমেন্ট স্কলারশিপের অধীনে মাস্টার্স ডিগ্রি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজি থেকে টেক্সটাইল টেকনোলজিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের দ্য টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের চার্টার্ড ফেলো (CText FTI)।
শিক্ষকতা, গবেষণা, শিল্প–পরামর্শ এবং উন্নয়ন সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডে তার দুই দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বস্ত্রশিল্পে টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, সম্পদ দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিকার্বনাইজেশন এবং শিল্প–গবেষণা সহযোগিতা বিষয়ে কাজ করে আসছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পকারখানার সঙ্গে তিনি পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণে উদ্ভাবনী ও টেকসই সমাধান উন্নয়নের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি Global Change Award 2025-এ “Decarbonization Lab for Textile Process Innovation” উদ্যোগের জন্য নির্বাচিত হন। তিনি বিশ্বাস করেন, গবেষণার প্রকৃত সার্থকতা তখনই অর্জিত হয়, যখন তা বাস্তব সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে শিল্প, সমাজ এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং বৈশ্বিক মানের গবেষণার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করাই তার কাজের অন্যতম প্রেরণা।





