সৌরশক্তিচালিত ভাসমান বিদ্যালয়ের জন্য
ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার পেল প্রযুক্তিনির্ভর ‘সিধুলাই’
প্রযুক্তি ও স্থানীয় উদ্ভাবনের সমন্বয়ে বাংলাদেশের জলাভূমি অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার অনন্য উদ্যোগ ‘ভাসমান বিদ্যালয়’ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। চলনবিল অঞ্চলে সৌরশক্তিচালিত নৌকাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা।
উদ্ভাবনী সৌরশক্তিচালিত ভাসমান বিদ্যালয় উদ্যোগের মাধ্যমে চলনবিল অঞ্চলের শিশু ও জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশের সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা।
ইউনেস্কো ঢাকা আয়োজিত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্যুরো অব নন-ফরমাল এডুকেশনের (বিএনএফই) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দেবব্রত চক্রবর্তী এবং ক্যাম্পেইনের (ক্যাম্পে) নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান ড. সুসান ভাইজ।
অনুষ্ঠানের সূচনা পর্বে ইউনেস্কো ঢাকার শিক্ষা বিভাগের প্রধান নোরিহিদে ফুরুকাওয়া ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫ এবং এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল যুগে সাক্ষরতার প্রসার’ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ববি হাজ্জাজ বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষাসেবা পৌঁছে দিতে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্ভাবনী উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম শুধু শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি বাড়ায় না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করতেও সহায়তা করে। সরকার এমন কার্যকর উদ্যোগকে উৎসাহিত ও সম্প্রসারণে কাজ করছে।
২০২৫ সালে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল অ্যাডাল্ট লিটারেসি এজেন্সি (নালা) এবং মরক্কোর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কারে ভূষিত হয়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা তরুণদের জন্য উদ্ভাবনী সাক্ষরতা কার্যক্রম পরিচালনার স্বীকৃতি হিসেবে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ড. সুসান ভাইজ বলেন, সাক্ষরতা শুধু পড়া-লেখা শেখার বিষয় নয়; এটি মানুষকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নতুন সুযোগ কাজে লাগানো এবং সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের সক্ষমতা দেয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আজীবন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে উদ্ভাবনী উদ্যোগের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার ভাসমান বিদ্যালয় প্রকল্পটি বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি অঞ্চল চলনবিলে পরিচালিত একটি ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা উদ্যোগ। বর্ষা মৌসুমে যখন বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তখন নৌকাভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার বিকল্প পথ তৈরি করে।
স্থানীয় নৌকা নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি প্রতিটি ভাসমান বিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে। বর্তমানে সিধুলাই ৫৬টি নৌকা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ২৬টি ভাসমান শ্রেণিকক্ষ, ১০টি ভাসমান গ্রন্থাগার ও কম্পিউটার ল্যাব, ৮টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং অন্যান্য নৌকা স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা ও পরিবহন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার নির্বাহী পরিচালক স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, স্থানীয় মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতেই টেকসই সমাধান তৈরি হয়। তিনি বলেন, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে আরও মানুষের কাছে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা।
উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সাল থেকে সাক্ষরতা ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা ও উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার প্রদান করে আসছে। চীন সরকারের অর্থায়নে প্রদত্ত ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। প্রতি বছর কার্যকর সাক্ষরতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় অবদানের জন্য বিশ্বের তিনটি প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
এর আগে বাংলাদেশ থেকে ফ্রেন্ডশিপ ২০২৩ সালে এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ২০১৩ সালে ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার অর্জন করেছিল।
//ডিবিটেক/আরআরটি/ এমইউআইএম//





