বাজেট ২০২৬-২৭: আইসিটি, টেলিকম, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, এডটেক, উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কী থাকছে?

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির পথে বাজেট ২০২৬-২৭

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গঠনের স্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছে। আইসিটি খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা, শিক্ষায় এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সারদের ভ্যাট অব্যাহতি এবং স্থানীয় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে কর-সুবিধা বাজেটের অন্যতম প্রধান দিক। একই সঙ্গে টেলিকম ও ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির পথে বাজেট ২০২৬-২৭
১১ জুন, ২০২৬ ১০:৫৪  

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল শিক্ষা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার। বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েই নতুন পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।

সরকারের ১০টি প্রধান অগ্রাধিকারের মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, উদ্ভাবনভিত্তিক এবং রপ্তানিমুখী ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা।

শিক্ষায় প্রযুক্তি ও এআই

নতুন বাজেটে প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ তৈরিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অন্তর্ভুক্ত করতে বেশ কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • “ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব” কর্মসূচি বাস্তবায়ন।

  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ।

  • শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা বৃদ্ধি।

  • এআইভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু।

  • ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা।

  • প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগ জোরদার, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।

গবেষণা, উদ্ভাবন ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

বাজেটে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকার গবেষণা কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি এবং বিদেশে অবস্থানরত দক্ষ বাংলাদেশি গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেবে।

একই সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষায় বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে জোর

তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিকে বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই), তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক কৃষিভিত্তিক শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহায়তা এবং নারী উদ্যোক্তাদের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

শিক্ষা খাতেও উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ, স্টার্টআপ চালু এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা হবে।

ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বড় স্বস্তি

ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে ইতিবাচক ঘোষণাগুলোর একটি এসেছে ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য।

বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের প্রদত্ত সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হবে। ফলে ফ্রিল্যান্সিং খাতের কর-ব্যয় কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই খাত আরও উৎসাহ পাবে।

আইসিটি শিল্পে কর-সুবিধা অব্যাহত

দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে একাধিক কর-সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি।

  • কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনারসহ প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত সম্প্রসারণ।

এতে দেশীয় হার্ডওয়্যার শিল্প, প্রযুক্তি কারখানা এবং আইটি ম্যানুফ্যাকচারিং খাত নতুন গতি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

টেলিকম খাতে স্বস্তির বার্তা

সরকার আইসিটিকে ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে বিবেচনা করে টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর বিদ্যমান কিছু কর-চাপ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় সিমের ওপর আরোপিত নির্দিষ্ট কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবও উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোবাইল ও ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।

ডিজিটাল অবকাঠামো ও স্মার্ট সেবা

ডিজিটাল বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিতে ইলেকট্রনিক টোল, স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন খাতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও বাজেটে উঠে এসেছে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রযুক্তি খাতকে শুধু একটি সেবা খাত হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করেছে। শিক্ষায় এআই, প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, ফ্রিল্যান্সারদের কর-সুবিধা এবং স্থানীয় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে প্রণোদনা- সব মিলিয়ে বাজেটটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

//ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউএম//