‘ব্রেন ড্রেন’ থেকে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’: প্রবাসীদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে উন্নয়নের মূলধন করতে চায় সরকার
সরকার বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’ ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রবাসী কার্ড চালু, ডিজিটাল অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনশক্তি গঠন এবং হোয়াইট-কলার কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রবাসীদের জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার করার পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগিয়ে ‘ব্রেন ড্রেন’ থেকে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তর ঘটাতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে প্রবাসীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও বিনিয়োগকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা মাহদী আমিন বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
১৩ জুন, শনিবার রাজধানী ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনৈতিক কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
মাহদী আমিন বলেন, অতীতে বিদেশে মেধাবী জনশক্তির স্থায়ীভাবে চলে যাওয়াকে ‘ব্রেন ড্রেন’ হিসেবে দেখা হলেও বর্তমান সরকার সেটিকে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এ রূপ দিতে চায়। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স প্রেরণকারী নন, তারা দেশের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শুধু ব্লু-কলার বা শ্রমনির্ভর কর্মসংস্থান নয়, হোয়াইট-কলার বা দক্ষ ও পেশাভিত্তিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগ করতে পারবেন, প্রযুক্তি স্থানান্তর করতে পারবেন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারবেন।
উপদেষ্টা বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজার বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল করা। এ জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে ‘প্রবাসী কার্ড’ বা ‘এক্সপ্যাট্রিয়েট কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের তথ্য একটি সমন্বিত সরকারি প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকবে, যা অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও নিরাপদ করবে।
মাহদী আমিন বলেন, ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করতে সরকার কাজ করছে। ভবিষ্যতে আবেদনকারীদের আর্থিক নথিপত্র ও শিক্ষাগত সনদ কিউআর কোডের মাধ্যমে যাচাইযোগ্য করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি চালু হওয়া একটি কর্মসূচির আওতায় বিদেশে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশি কর্মীদের অর্জিত সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে কাজ করছে সরকার। এর ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে এবং দক্ষ কর্মীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশি কর্মীদের শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, অভিবাসনকে সরকার একটি বৃহত্তর উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রবাসীদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন।
সম্মেলনে তিনটি বিষয়ভিত্তিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব অধিবেশনে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতি, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ সংগ্রহ, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীল শিল্প ও ক্রীড়াসহ উদীয়মান প্রবৃদ্ধি খাত নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বৈশ্বিক রূপান্তর, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার এ সময়ে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক কূটনীতি শক্তিশালী করা, নীতিগত সমন্বয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও গভীর করা।
//ডিবিটেক/এসআই/এমআই//





