সমুদ্রের অজানা গভীরতায় বাংলাদেশের স্বপ্ন: 

বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে যাচ্ছে এমআইএসটি মাভিরভ

কানাডার মাটিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে আন্ডারওয়াটার রোবোটিক্স দল

বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে যাচ্ছে এমআইএসটি মাভিরভ
১১ জুন, ২০২৬ ০০:৩০  

বিশ্বের মহাসাগরের ৯০ শতাংশেরও বেশি অঞ্চল এখনো মানুষের কাছে অজানা। সেই অজানা নীল জগতের রহস্য উন্মোচনের স্বপ্ন নিয়েই কয়েক বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল একদল তরুণ প্রকৌশল শিক্ষার্থী। আজ সেই উদ্যোগই পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল আন্ডারওয়াটার রোবোটিক্স দল ‘এমআইএসটি মাভিরভ’-এ (MIST MAVIROV)।

ঢাকার মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি )-এর শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা এই দলটি এবার যোগ্যতা অর্জন করেছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আন্ডারওয়াটার রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা ‘২০২৬ মেট রোভ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ অংশ নেওয়ার। আগামী ২৩ জুন কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরে অনুষ্ঠিত হবে এই প্রতিযোগিতা।

বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়া ২৬ সদস্যের দলটি ১৮ জুন কানাডার উদ্দেশে রওনা হবে। ইতোমধ্যে দলের সব সদস্যের ভিসা ও বিমান টিকিট নিশ্চিত হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের হাতে তৈরি অত্যাধুনিক রোবট

এমআইএসটি মাভিরভের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের নিজস্বভাবে তৈরি রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল (ROV) ‘মাভিরিও’। সম্পূর্ণ শিক্ষার্থী-নির্ভর গবেষণা, নকশা, উন্নয়ন ও পরীক্ষার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে এই আন্ডারওয়াটার রোবট।

মাভিরিওতে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা, শক্তিশালী আলোকসজ্জা ব্যবস্থা, ২ ডিগ্রি অব ফ্রিডম (2-DOF) রোবোটিক ম্যানিপুলেটর আর্ম এবং মাল্টিপারপাস গ্রিপার। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্রতলের নমুনা সংগ্রহ, পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ, সাবসি অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং জটিল প্রকৌশল কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।

গবেষণা থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে

দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল সমুদ্র প্রযুক্তি ও সামুদ্রিক রোবোটিক্স নিয়ে আগ্রহী কিছু শিক্ষার্থীর উদ্যোগে। পরবর্তীতে ‘লেভিয়াথান ১.০’, ‘লেভিয়াথান ২.০’ এবং ‘ক্রিপার ১.০’-এর মতো প্রকল্পে কাজের মাধ্যমে তারা অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

একই সঙ্গে বেয়ার সামিট, ডিডিআই এক্সপোসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রযুক্তি প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করে। বর্তমানে দলে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সফটওয়্যার, গবেষণা ও উন্নয়ন, ডিজাইন, গ্রাফিক্স, জনসংযোগ ও মার্কেটিংসহ বিভিন্ন শাখার শিক্ষার্থীরা কাজ করছেন।

দলের কারিগরি তত্ত্বাবধানে রয়েছেন মেন্টর মেজর মোহাম্মদ নাঈম উদ্দিন।

কী করতে হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে?

মেট রোভ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মূল্যায়ন করা হয় তিনটি প্রধান সূচকে—মিশন পারফরম্যান্স, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত উপস্থাপনা এবং নিরাপত্তা।

এমআইএসটি মাভিরভকে সমুদ্র গবেষণা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অফশোর জ্বালানি খাতের বাস্তব পরিস্থিতির অনুকরণে তৈরি একাধিক মিশন সম্পন্ন করতে হবে।

এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রতল থেকে জীববৈচিত্র্যের নমুনা সংগ্রহ, সাব-সি অবজারভেটরির সেন্সর পরিবর্তন, অফশোর উইন্ড-পাওয়ার অবকাঠামোতে সংযোগ স্থাপন এবং বরফাচ্ছন্ন পরিবেশে পরিচালনাগত সক্ষমতা প্রদর্শন।

‘রোবট দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ডাইভিংয়ের বিকল্প তৈরি করতে চাই’

দলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহিবুল হক বলেন, “আমরা কয়েকজন স্বপ্নবাজ প্রকৌশল শিক্ষার্থী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলাম। সমুদ্রের বিশাল অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত। সেই অজানা জগতকে জানার আগ্রহ থেকেই আমাদের পথচলা।”

তিনি বলেন, “মাভি শব্দটি সমুদ্রের নীল রঙকে প্রতিনিধিত্ব করে। আমরা এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে চাই যা ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ আন্ডারওয়াটার ডাইভিংয়ের বিকল্প হিসেবে নিরাপদ ও কার্যকর রোবট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে।”

মাহিবুল আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু রোবট তৈরি নয়; নতুন প্রজন্মকে সামুদ্রিক রোবোটিক্সে আগ্রহী করা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।”

বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে এমআইএসটি মাভিরভ। আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে অংশগ্রহণ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; বরং বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীদের গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলে ধরার বড় সুযোগ।

সমুদ্র অর্থনীতি, ব্লু ইকোনমি এবং সামুদ্রিক প্রযুক্তি উন্নয়নের যুগে মিস্ট মাভিরভের এই যাত্রা বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

//ডিবিটেক/আইরিশ/এমইউআইএম//