ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (ডব্লিউএসআইএস) ফোরাম ২০২৬
বাংলাদেশের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অংশগ্রহণ কেন জরুরি?
ডিজিটাল রূপান্তর এখন আর শুধু প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, নিরাপত্তা, উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সেবার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। যে রাষ্ট্র ডিজিটাল নীতি, প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার, ডেটা সুরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় সক্রিয় থাকে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যতের নীতি তৈরিতে প্রভাব রাখতে পারে। আর যে রাষ্ট্র অনুপস্থিত থাকে, তাকে অনেক সময় অন্যের তৈরি নীতি মেনে চলতে হয়।
বাংলাদেশ গত দুই দশকে ডিজিটাল সেবা, মোবাইল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সংযোগ সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ডিজিটাল জনসেবা এবং দুর্যোগকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই অগ্রগতি কীভাবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, আস্থাভিত্তিক, অধিকারসম্মত এবং মানুষকেন্দ্রিক হবে। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্যই ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি বা ডব্লিউএসআইএস প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণ জরুরি।
বাংলাদেশের সঙ্গে ডব্লিউএসআইএস প্রক্রিয়ার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৩ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ডব্লিউএসআইএসের প্রথম ধাপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা এবং ২০০৫ সালে তিউনিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপে তৎকালীন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ডিজিটাল কূটনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই সময় ডব্লিউএসআইএস ছিল তথ্যসমাজ গঠনের বৈশ্বিক অঙ্গীকার। আজ, দুই দশক পরে, সেই অঙ্গীকার আরও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অর্থনীতি, প্ল্যাটফর্ম ক্ষমতা, সাইবার ঝুঁকি, ভুয়া তথ্য, অনলাইন সহিংসতা এবং ডিজিটাল বৈষম্য।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ৬ থেকে ১০ জুলাই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠেয় ডব্লিউএসআইএস ফোরাম ২০২৬ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু আরেকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ডব্লিউএসআইএস প্লাস ২০ পর্যালোচনার পর এটি হবে প্রথম ডব্লিউএসআইএস ফোরাম, যেখানে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত নবায়ন হওয়া বৈশ্বিক ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হবে। অর্থাৎ, আগামী দশকের বৈশ্বিক ডিজিটাল সহযোগিতা কোন পথে যাবে, সে আলোচনা এখান থেকেই নতুন গতি পাবে।
বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণ এখানে তিনটি কারণে অপরিহার্য।
প্রথমত, বাংলাদেশের নিজস্ব ডিজিটাল উন্নয়ন অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক নীতিমঞ্চে তুলে ধরা দরকার। দেশের ডিজিটাল জনসেবা, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কমিউনিটি পর্যায়ের সংযোগ, দুর্যোগকালীন যোগাযোগ, তরুণ উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় উদ্ভাবনের অভিজ্ঞতা বৈশ্বিক আলোচনায় মূল্যবান অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গ্রাম-শহরের ডিজিটাল বৈষম্য, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, সাইবার নিরাপত্তা, ভুয়া তথ্য, অনলাইন সহিংসতা, শিশু ও নারীর ডিজিটাল নিরাপত্তা, ডেটা সুরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সাক্ষরতা এখন নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রীয় বিষয়। এসব বিষয়ে বাংলাদেশকে কেবল শ্রোতা নয়, সক্রিয় বক্তা হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ডব্লিউএসআইএস ফোরাম একটি বহুপক্ষীয় জাতিসংঘ প্ল্যাটফর্ম। এখানে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তি কমিউনিটি, একাডেমিয়া, যুবসমাজ ও উন্নয়ন অংশীদাররা একসঙ্গে কাজ করে। তাই বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিক বা প্রতিনিধি পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত কৌশলগত। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা উপদেষ্টার নেতৃত্বে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ডিজিটাল সহযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, স্থানীয় ভাষার কনটেন্ট এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে সহায়তা করবে।
তৃতীয়ত, জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার উপস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের ডিজিটাল শাসন শুধু স্পেকট্রাম বা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রাহক অধিকার, প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহি, ডেটা প্রবাহ, অনলাইন নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতা, সাশ্রয়ী সংযোগ, বাজার কাঠামো এবং জনআস্থার প্রশ্ন। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন ডিজিটাল অধিকার, ডিজিটাল বাজার এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা গঠনের অন্যতম প্রধান অভিনেতা। ডব্লিউএসআইএস ফোরামে অন্যান্য দেশের নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় বাংলাদেশের নীতিগত প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সমস্যা হলো, যেসব দেশ এ ধরনের বৈশ্বিক ফোরামে সক্রিয় থাকে না, তারা অনেক সময় নীতি প্রণেতা নয়, নীতি গ্রহণকারী হয়ে পড়ে। ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রবাহ, অনলাইন নিরাপত্তা, প্রযুক্তির নৈতিকতা ও প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে আলোচনা চলছে, তা ভবিষ্যতে জাতীয় নীতি, বাজার, নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ যদি সেখানে উচ্চপর্যায়ে দৃশ্যমান না থাকে, তবে নীতিগত প্রভাব বিস্তার, অংশীদারত্ব, সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও জ্ঞানবিনিময়ের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
তাই ডব্লিউএসআইএস ফোরাম ২০২৬ সামনে রেখে বাংলাদেশের একটি সুস্পষ্ট জাতীয় প্রস্তুতি প্রয়োজন। প্রথমত, বাংলাদেশ একটি সংক্ষিপ্ত জাতীয় অবস্থানপত্র প্রস্তুত করতে পারে, যেখানে দেশের অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার তুলে ধরা হবে। এসব অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকতে পারে সবার জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, ডিজিটাল সাক্ষরতা, দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সুরক্ষা, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, নারীর অনলাইন নিরাপত্তা, শিশু সুরক্ষা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি, স্থানীয় ভাষার কনটেন্ট, যুব উদ্ভাবন এবং কমিউনিটি মিডিয়া।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ফোরামে একটি জাতীয় সাইড ইভেন্ট বা নীতি সংলাপ আয়োজন করতে পারে। সেখানে বাংলাদেশের ডিজিটাল উন্নয়ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা আহ্বান এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা সম্ভব। প্রতিনিধিদলে নারী, যুব, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, একাডেমিয়া, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা ডব্লিউএসআইএসের বহুপক্ষীয় চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
তৃতীয়ত, অংশগ্রহণ যেন জেনেভাতেই শেষ না হয়। দেশে ফিরে মন্ত্রণালয়, উপদেষ্টার দপ্তর, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে একটি ফলোআপ ব্যবস্থা গঠন করা দরকার। ডব্লিউএসআইএস অ্যাকশন লাইনগুলো কীভাবে বাংলাদেশের জাতীয় ডিজিটাল নীতি, এসডিজি অগ্রাধিকার, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে একটি বাস্তবায়ন নোট তৈরি করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দেখিয়েছে, সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও জনস্বার্থ একসঙ্গে কাজ করলে ডিজিটাল রূপান্তর মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। এখন প্রয়োজন বৈশ্বিক ডিজিটাল সহযোগিতার পরবর্তী পর্যায়ে সক্রিয়, দৃশ্যমান ও কৌশলগত ভূমিকা নেওয়া। ডব্লিউএসআইএস ফোরাম ২০২৬ সেই সুযোগ এনে দিয়েছে।
বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা। মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণ শুধু কূটনৈতিক উপস্থিতি নয়; এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ রক্ষার, বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে অবদান রাখার এবং মানুষকেন্দ্রিক তথ্যসমাজ গঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
লেখকঃ ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর





