স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে দক্ষ প্রোগ্রামার ও প্রযুক্তিবিদ তৈরির বিকল্প নেই: মন্ত্রী
রাজধানীতে জাতীয় হাই স্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা ২০২৬-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে আইসিটি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম চ্যাম্পিয়নদের ল্যাপটপ ও রানার্সআপদের ট্যাব প্রদান করেন। মাধ্যমিকে বিএএফ শাহীনের রাইয়্যান ফেরদৌস এবং উচ্চ মাধ্যমিকে কার্ডিফ ইন্টারন্যাশনালের ওয়ালি জামান চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। মন্ত্রী জানান, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি গড়তে বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং তরুণদের এআই যুগে দক্ষ করতে সরকার পাশে আছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে বিশ্ববাজারের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দেশে দক্ষ প্রোগ্রামার, কোডার ও প্রযুক্তিবিদ তৈরির কোনো বিকল্প নেই। আজকের তরুণ শিক্ষার্থীরাই তাদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে আগামী দিনের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার মূল নেতৃত্ব দেবে।
১৩ জুন, শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্স অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘জাতীয় হাই স্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফিনালে, সমাপনী ও জমকালো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই সুদূরপ্রসারী প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী জনাব ফকির মাহবুব আনাম।
শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতন ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে, তরুণদের প্রযুক্তিগত মেধার বিকাশে আর্থিক অনুদানসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিয়ে বর্তমান সরকার সবসময় তাদের পাশে আছে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে সামাজিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে শিক্ষাদীক্ষা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে। আমাদের মায়েরা এখন বাচ্চাদের পড়াশোনা ও মেধা বিকাশের পেছনে অনেক বেশি সময় ও শ্রম দিচ্ছেন। তবে বর্তমান সময়ে চারদিকে যেভাবে মাদকের মারাত্মক বিস্তার দেখা দিয়েছে, তাতে সন্তানদের রক্ষায় মা-বাবা উভয়কেই গভীর নজরদারি বাড়াতে হবে।”
বিশ্বের সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত রূপান্তর উল্লেখ করে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আরও বলেন, “বিশ্ব এখন চ্যাটজিপিটি ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (AI) এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। এই সময়ে মেধাবীদের জন্য বিশ্বব্যাপী ক্যারিয়ারের এক বিশাল সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নিত্যনতুন উদ্ভাবনের সঙ্গে নিজেদের এখনই প্রস্তুত করতে হবে। ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সফল হতে কারিগরি দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই।”
মন্ত্রী সরকারের নির্বাচনী ও কৌশলগত অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, দেশের আইসিটি খাতের তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতার সর্বোচ্চ উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ফান্ডের সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে দেশীয় পণ্যের সংযুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার অত্যন্ত জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তায় ফকির মাহবুব আনাম বলেন, “মনে রাখবে, প্রতিটি বড় উদ্ভাবনই শুরু হয় একটি খুব ছোট প্রশ্ন থেকে। তাই প্রশ্ন করতে শেখো, চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে শেখো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে শেখো এবং ব্যর্থতাকে বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবনের অদম্য সাহস অর্জন করো।” তিনি গভীর আশা প্রকাশ করেন যে, এই প্রতিযোগিতা থেকে উঠে আসা খুদে কোডাররাই ভবিষ্যতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, উচ্চতর গবেষণা এবং বিশ্বমানের সফটওয়্যার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের সুনাম বিশ্বদরবারে আরও উজ্জ্বল করবে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) নির্বাহী পরিচালক এ টি এম জিয়াউল ইসলাম-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা, এনসিএসএ-এর মহাপরিচালক ড. মো. তৈয়বুর রহমান, অতিরিক্ত পরিচালক মো. আনোয়ার উদ্দিন এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের পরিচালক মো. জফুরুল আলম খান।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিশিষ্ট আলোচক ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রোগ্রামিং, জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধান এবং উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশে এ ধরনের জাতীয় প্রতিযোগিতা তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমাদের এই নতুন প্রজন্ম আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি স্মার্ট ও প্রযুক্তি-বান্ধব। আর এই তরুণদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশে একটি টেকসই ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ (সৃজনশীল অর্থনীতি) গড়ে তুলতে সরকার এবারের জাতীয় বাজেটে বিশেষ কোটায় ৫০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দিয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও কোডিং আজ মানুষের সবকিছুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে এবং এই তরুণ অলিম্পিয়াডরাই একদিন বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করবে। তরুণরা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় অযথা সময় নষ্ট করে না, বরং তারা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে দারুণ সাফল্য ছিনিয়ে এনে তার প্রমাণ দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে সেরাদের হাতে মেডেল, ট্রফি, সার্টিফিকেট ও মূল্যবান পুরস্কার তুলে দেন মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এবারের প্রতিযোগিতায় মেধার অনন্য স্বাক্ষর রেখে মাধ্যমিক (স্কুল) ক্যাটাগরিতে ঢাকা বিভাগের বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থী রাইয়্যান ফেরদৌস এবং উচ্চ মাধ্যমিক (কলেজ) ক্যাটাগরিতে ঢাকার কার্ডিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থী ওয়ালি জামান দেশসেরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন দলের হাতে পুরস্কার হিসেবে সর্বাধুনিক ল্যাপটপ এবং রানার্সআপদের হাতে একটি করে ব্র্যান্ডেড ট্যাব তুলে দেওয়া হয়।
এছাড়াও একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সাইবার সিকিউরিটি অলিম্পিয়াড বিজয়ী ও সেফার ইন্টারনেট দিবসের প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতের পুরস্কার তুলে দেয়া হয়।
প্রসঙ্গত, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির উদ্যোগে ও আইসিটি বিভাগের সহযোগিতায় দেশব্যাপী সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ সাইবার সিকিউরিটি অলিম্পিয়াড ২০২৬’। সারা দেশের ৪,৯১১ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে কঠোর বাছাই শেষে আঞ্চলিক পর্বের সেরা ৫১ জনকে নিয়ে ৪ দিনব্যাপী একটি নিবিড় আবাসিক মেন্টরিং বুটক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। সেই বুটক্যাম্প শেষে গতকাল ১২ জুন চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যার ধারাবাহিকতায় আজ এই সমাপনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এমআই//





