ডাক ও টেলিযোগাযোগে বরাদ্দ কমলেও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি

সিম করে স্বস্তি থাকলেও অসন্তুষ্ট ব্রডব্যান্ড ব্যবসায়ীরা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জন্য ২,১৪১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিগত মূল বাজেটের চেয়ে কম হলেও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। বাজেটে মোবাইল সিমের ৩০০ টাকার কর তুলে দিয়ে ১৫% স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাট করায় এমটব একে স্বাগত জানিয়েছে। তবে ফাইবার অপটিক সম্প্রসারণে কোনো সুবিধা না রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আইএসপিএবি। তাদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ৫৬ শতাংশ হলেও দেশ এখনো ৯ শতাংশ ব্রডব্যান্ড পেনিট্রেশনে আটকে আছে, যা ফ্রিল্যান্সিং ও ফিনটেক খাতের বিকাশে বাধা সৃষ্টি ক

সিম করে স্বস্তি থাকলেও অসন্তুষ্ট ব্রডব্যান্ড ব্যবসায়ীরা
১১ জুন, ২০২৬ ২০:২৫  
১১ জুন, ২০২৬ ২২:২৯  

দেশের সামগ্রিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি বিকাশের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জন্য মোট ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ৫৫তম এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদের প্রথম এই মেগা বাজেট পেশ করেন। নতুন এই বাজেটে মোবাইল সিমের কর কাঠামোতে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ায় মোবাইল খাতের অংশীজনরা স্বস্তি প্রকাশ করলেও তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ জানিয়েছেন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা। ১ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে যাওয়া এই বাজেটে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়ন বরাদ্দ আগের বছরের মূল বাজেটের তুলনায় হ্রাস পেলেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিবরণী থেকে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মোট বরাদ্দ ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক বা পরিচালন খাতে ১ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বা উন্নয়ন খাতে ৯৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আর্থিক খাতের তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের মূল বাজেটে এই বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, যা আসন্ন বাজেটের চেয়ে সামান্য বেশি। 

তবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা (পরিচালন ১ হাজার ২১২ কোটি এবং উন্নয়ন ৭৭৫ কোটি টাকা) নির্ধারণ করা হয়েছিল। অন্যদিকে, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বিভাগের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিচালন খাতে ১ হাজার ১২৩ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ৮৪৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। 

অর্থাৎ, সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এবার বরাদ্দ বাড়লেও মূল বাজেটের তুলনায় খাতটিতে বরাদ্দ কমেছে এবং এর বড় প্রভাব পড়েছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিতে। প্রথা অনুযায়ী, সংসদে উপস্থাপনের আগে বাজেটটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয় এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এতে সম্মতি জানিয়ে স্বাক্ষর করেন।

নতুন এই বাজেটে মোবাইল সিমের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর প্রত্যাহার করে বিক্রয়মূল্যের ওপর ১৫% হারে ভ্যাট (মূল্যভিত্তিক বা স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন ‘এমটব’-এর মহাসচিব লে. কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার (অব.) বলেন, “আমরা মনে করি এই পরিবর্তন দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—যারা এখনো টেলিযোগাযোগ সেবার বাইরে রয়েছেন—তাদের অন্তর্ভুক্তির পথে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং ডিজিটাল অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে।” তবে খাতটির টেকসই উন্নয়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরের গতি আরও জোরদার করতে ভোক্তাদের ওপর করের বোঝা হ্রাস, করপোরেট কর হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, স্পেকট্রামের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার এবং ওটিটি (OTT) সেবার ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্ক বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান তিনি।

মোবাইল অপারেটররা এই কর সংস্কারে খুশি হলেও প্রস্তাবিত বাজেটে বড় ধরনের ‘বিষম’ খেয়েছেন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা। দেশে বর্তমানে মোট নাগরিকের দ্বিগুণ সিম কার্ড সক্রিয় থাকলেও প্রান্তিক পর্যায়ে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বাজেটে কোনো বিশেষ সুবিধা বা প্রণোদনা রাখা হয়নি। 

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি আমিনুল হাকিম বাজেট প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন যে, ফাইবার অপটিক সম্প্রসারণে সুবিধা না রাখায় পিছিয়ে থাকা এই খাত আদতে কিছুই পায়নি। তার ভাষায়, “সিম কিংবা ল্যাপটপ বা পিসির দাম কমালেই ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে না। কারণ, এসব ডিভাইসের ‘মৌলিক শক্তি’ হলো শক্তিশালী ও নিরবচ্ছিন্ন ‘কানেক্টিভিটি’। তাই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পেনিট্রেশন না বাড়ালে এগুলো কোনো কাজে আসবে না।”

আইএসপিএবি সভাপতি আরও বলেন, “সদ্য প্রস্তাবিত বাজেটে ডিজিটাল সংযোগ বা ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের জন্য কার্যকর কিছুই করা হয়নি। অথচ একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছাতে হলে মোট জনসংখ্যার ন্যূনতম ৫৬ শতাংশের কাছে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছানোর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক নির্ধারিত আছে; সেখানে আমরা এখনো মাত্র ৯ শতাংশে আটকে আছি। সাশ্রয়ী মূল্যের উচ্চগতির ইন্টারনেটের পেনিট্রেশন ও শতভাগ কভারেজ ছাড়া ফ্রিল্যান্সার, ফিনটেক, হেলথটেক, এডটেকসহ কোনো সম্ভাবনাময় খাতই প্রকৃত অর্থে বিকশিত হতে পারবে না।” 

এমন পরিস্থিতিতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পেনিট্রেশন বাড়াতে আইএসপিএবি’র সিনিয়র ভাইসপ্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক বলেন, বেসিক ইনফ্রাস্টাকচার নেই। এনটিটিএন নেটওয়ার্ক অপ্রতুল। প্রতিটি বাসা-বাড়ি পর্যন্ত টেকসই এক্সেস নেটওয়ার্ক নেই। তাই এই মুহুর্তে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে আইএসপিদের সরাসরি প্রণোদনা দেয়া উচিত।  

বাজেট বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উন্নয়ন বাজেট হ্রাস পাওয়ায় গ্রামীণ পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো সম্প্রসারণের সরকারি প্রকল্পগুলো ধীরগতির মুখে পড়তে পারে, যা ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করবে।  একইসঙ্গে ফাইবার অপটিক খাতে কর রেয়াত না দেওয়ার কারণে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছানোর গতি শ্লথ হয়ে যাবে, যা সরকারের ক্যাশলেস ও ডিজিটাল ইকোনমি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

//ডিবিটেক/এসআই/এমইউএম//