ইনকগনিটো মোড মানেই কি ‘অদৃশ্য’ হওয়া?

ইনকগনিটো মোড মানেই কি ‘অদৃশ্য’ হওয়া?
৮ জুন, ২০২৬ ১০:২০  
৭ জুন, ২০২৬ ১৫:২১  

গুগল ক্রোম ব্রাউজারে ‘ইনকগনিটো মোড’ চালু করলেই স্ক্রিনটি অন্ধকার ও রহস্যময় হয়ে ওঠে। চোখে কালো চশমা আর হ্যাট পরা একটি আইকন ভেসে আসে, যা দেখে মনে হয়—ইন্টারনেটের দুনিয়ায় আপনি সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছেন এবং কেউ আপনার কর্মকাণ্ড দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি মস্ত বড় ভুল ধারণা। ইনকগনিটো বা প্রাইভেট ব্রাউজিং মোড আপনার লোকাল বা ডিভাইসের ব্রাউজিং হিস্ট্রি আড়াল করতে পারলেও, অনলাইনের বিশাল দুনিয়ায় আপনাকে মোটেও অদৃশ্য বা সম্পূর্ণ নিরাপদ করে তোলে না

ইনকগনিটো মোড আসলে কী লুকায়?

সহজ কথায়, ইনকগনিটো বা প্রাইভেট ব্রাউজিং মূলত আপনার ব্যবহৃত ডিভাইসটির ভেতরে তথ্যের রেকর্ড রাখা বন্ধ করে। আপনি যখন একটি ইনকগনিটো উইন্ডো বন্ধ করে দেবেন, তখন ব্রাউজার নিচে উল্লিখিত কাজগুলো করে:

  • আপনার পরিদর্শিত কোনো ওয়েবসাইটের নাম মূল ‘ব্রাউজার হিস্ট্রি’-তে জমা রাখে না
  • ব্রাউজিং সেশনের সময় তৈরি হওয়া সব ধরনের ‘কুকিজ’ (Cookies) এবং সাইট ডেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলে। এর ফলে পরবর্তীতে সাধারণ উইন্ডো খুললে ওয়েবসাইটগুলো আপনাকে আগের সেশনের ব্যবহারকারী হিসেবে চিনতে পারে না
  • সার্চ বার বা কোনো অনলাইন ফরমে আপনার টাইপ করা তথ্য (যেমন—ঠিকানা বা ইউজারনেম) অটো-কমপ্লিটের জন্য সংরক্ষণ করা হয় না

গুগল ক্রোমে একে ‘ইনকগনিটো মোড’ বলা হলেও সাফারি (Safari) ও ফায়ারফক্স (Firefox)-এ একে বলা হয় ‘প্রাইভেট ব্রাউজিং’ এবং মাইক্রোসফট এজ (Edge)-এ এর নাম ‘ইনপ্রাইভেট ব্রাউজিং’। সবগুলোর মূল কাজই এক—আপনার নিজের ডিভাইসে ব্রাউজিংয়ের প্রমাণ না রাখা

তবে এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। ইনকগনিটো মোডে থাকা অবস্থায় আপনি যদি কোনো ফাইল কম্পিউটারে ডাউনলোড করেন, তবে উইন্ডো বন্ধ করলেও সেই ফাইলটি আপনার স্টোরেজে থেকে যাবে এবং যে কেউ তা খুঁজে পাবে। একইভাবে সেভ করা ‘বুকমার্ক’ বা ফেভারিট সাইটগুলোও মুছে যাবে না। এ ছাড়া কাজ শেষে ব্রাউজারের সব কটি প্রাইভেট ট্যাব বা উইন্ডো সম্পূর্ণ বন্ধ না করলে তথ্যগুলো পুরোপুরি মুছে যায় না

কারা এখনো দেখতে পাচ্ছে আপনার অনলাইন কর্মকাণ্ড?

ইনকগনিটো মোড অন থাকা সত্ত্বেও অনলাইনের বেশ কয়েকটি পক্ষ আপনার প্রতি মুহূর্তের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতে পারে:

  • পরিদর্শিত ওয়েবসাইটসমূহ: ইনকগনিটো মোড কোনো ওয়েবসাইটকে আপনার ডেটা সংগ্রহ করা থেকে আটকাতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা, আপনি যদি প্রাইভেট উইন্ডোর ভেতরে আপনার ফেসবুক, অ্যামাজন বা গুগল অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করেন, তবে সেই প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিকভাবে জেনে যায় যে আপনি সেখানে কী করছেন
  • ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ISP): আপনি বাসা বা অফিসের যে কোম্পানির ইন্টারনেট (ব্রডব্যান্ড বা মোবাইল ডেটা) ব্যবহার করছেন, তারা স্পষ্ট দেখতে পায় আপনি কোন কোন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করছেন। ইনকগনিটো মোড আপনার ইন্টারনেট লাইনে কোনো অতিরিক্ত এনক্রিপশন বা গোপনীয়তা যুক্ত করে না
  • অফিস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক: আপনি যদি অফিস বা স্কুলের ওয়াইফাই বা তাদের দেওয়া কম্পিউটার ব্যবহার করেন, তবে ইনকগনিটো মোড অন করলেও প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক মনিটরিং সফটওয়্যার এবং ফায়ারওয়াল আপনার সব ট্রাফিক বা হিস্ট্রি নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতে পারে
  • গুগল ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা: বিভিন্ন ওয়েবসাইটের ভেতরে লুকিয়ে থাকা গুগলের অ্যানালিটিক্স টুল এবং ট্র্যাকিং কোডগুলো ইনকগনিটো মোডেও ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এই বিষয়টি নিয়ে ২০২০ সালে গুগলের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে একটি বড় মামলা হয়, যেখানে অভিযোগ করা হয় যে গুগল ইনকগনিটো মোডের ব্যবহারকারীদের ডেটাও গোপনে ট্র্যাকিং করছে। এরই প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালে গুগল বিলিয়ন বিলিয়ন ডেটা রেকর্ড ধ্বংস করতে এবং তাদের প্রাইভেট ব্রাউজিংয়ের শর্তাবলী আপডেট করতে বাধ্য হয়

এটি কি আপনার আইপি অ্যাড্রেস লুকায়?

না, ইনকগনিটো মোড আপনার ইন্টারনেট প্রোটোকল বা আইপি (IP) অ্যাড্রেস কোনোভাবেই লুকাতে পারে না। ফলে আপনার সাধারণ ভৌগোলিক অবস্থান ও ইন্টারনেট সংযোগের পরিচয় ওয়েবসাইটগুলোর কাছে উন্মুক্তই থাকে। আপনি যদি আপনার আইপি অ্যাড্রেস এবং ইন্টারনেট ট্রাফিককে আইএসপি বা হ্যাকারদের চোখ থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে এনক্রিপ্ট করতে চান, তবে ইনকগনিটো মোডের পরিবর্তে একটি নির্ভরযোগ্য ভিপিএন (VPN - Virtual Private Network) ব্যবহার করতে হবে

কখন ইনকগনিটো মোড ব্যবহার করা উচিত?

ইনকগনিটো বা প্রাইভেট ব্রাউজিং কোনো বৈশ্বিক সুরক্ষাকবচ নয়, এটি মূলত একটি ‘লোকাল প্রাইভেসি টুল’। এটি তখনই ব্যবহার করা উচিত যখন:

১. আপনি অন্য কারো কম্পিউটার বা কোনো পাবলিক সাইবার ক্যাফেতে নিজের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছেন

২. পরিবারের কাউকে সারপ্রাইজ গিফট দেওয়ার জন্য গোপনে কোনো শপিং সাইট ব্রাউজ করছেন

৩. এমন কিছু সার্চ করছেন যা আপনি নিজের ব্যক্তিগত ব্রাউজার হিস্ট্রিতে রাখতে চান না

৪. মূল অ্যাকাউন্ট লগ-আউট না করেই একই ব্রাউজারে সাময়িকভাবে দ্বিতীয় আরেকটি অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করতে চাচ্ছেন

বিভিন্ন ব্রাউজারে ইনকগনিটো উইন্ডো খোলার নিয়ম:

  • গুগল ক্রোম: ডানদিকের থ্রি-ডট মেনু থেকে New Incognito window সিলেক্ট করুন। (শর্টকাট: Ctrl + Shift + N)
  • সাফারি (ম্যাক): মেনু বার থেকে File চাপুন এবং New Private Window সিলেক্ট করুন। (শর্টকাট: Command + Shift + N)
  • মোজিলা ফায়ারফক্স: ডানদিকের থ্রি-লাইন মেনু থেকে New private window সিলেক্ট করুন। (শর্টকাট: Ctrl + Shift + P)
  • মাইক্রোসফট এজ: ডানদিকের থ্রি-ডট মেনু থেকে New InPrivate window সিলেক্ট করুন। (শর্টকাট: Ctrl + Shift + N)