কে এই ড. মুশতাক ইবনে আয়ূব?
শিক্ষক, গবেষক, বিজ্ঞানী, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, সংগঠক, লেখক ও টেলিভিশন উপস্থাপক—এক ব্যক্তির এতগুলো পরিচয় সচরাচর দেখা যায় না। সম্প্রতি টিভি উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ড. মুশতাক ইবনে আয়ূব। তবে তার পরিচয় কেবল একজন তারকা উপস্থাপকের জীবনসঙ্গী হিসেবে নয়; বরং শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান ও সমাজসেবায় দীর্ঘদিনের অবদানের কারণে তিনি নিজেই একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ের নাম।
ছাত্রজীবন থেকেই অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখে আসছেন ড. মুশতাক। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় মাদারীপুর জেলায় প্রথম স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে তার সাফল্যের যাত্রা শুরু। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন যথাক্রমে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং নটরডেম কলেজ থেকে। উভয় পরীক্ষাতেই তার গড় নম্বর ছিল ৮১ শতাংশের বেশি।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অনার্স ও মাস্টার্স- উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। একাডেমিক উৎকর্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এর মধ্যে একটি ছিল মাস্টার্সে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের জন্য এবং অন্যটি শিশুদের থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে গবেষণার জন্য ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’।
মাস্টার্স সম্পন্ন করার অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এরপর উচ্চতর গবেষণার জন্য যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। মর্যাদাপূর্ণ কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে তিনি সেখানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল কোলোরেক্টাল ক্যান্সার কোষের বৈচিত্র্য এবং CD24-এর এপিজেনেটিক নিয়ন্ত্রণ। গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বিশ্বের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যার ওয়াল্টার বডমার।
অক্সফোর্ডে অবস্থানকালে ড. মুশতাক বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। তিনি অনলাইন ভোটে হার্টফোর্ড কলেজের গবেষকদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া প্রথম বাংলাদেশি। পরে একই কলেজে ডিনের সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া অক্সফোর্ডে প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করে প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন।
তার আন্তর্জাতিক অর্জনের তালিকাও দীর্ঘ। ইতালিতে ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ক্যান্সার সেন্টার থেকে ক্যান্সার জেনেটিক সার্ভিস বিষয়ে ফেলোশিপ সম্পন্ন করেন। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশনের Alumni UK Awards-এর বৈশ্বিক ক্যাটাগরিতে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গবেষক হিসেবে স্বীকৃতি পান। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের Howard Brain Sciences Foundation-এর নির্বাচিত ফেলো হিসেবেও সম্মানিত হন।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও রয়েছে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। মৌলিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুটি পেটেন্ট অর্জন করেছেন তিনি। ক্যান্সার গবেষণা, জেনেটিক্স এবং বায়োটেকনোলজি নিয়ে তার কাজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে।
দেশে তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরির লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইয়াং বায়োটেকনোলজিস্টস অব বাংলাদেশ (YOUNG BB)’। বর্তমানে সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ক্যান্সার সচেতনতা বৃদ্ধি ও রোগীদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করেন Cancer Care and Research Trust (CCRT), যা জনস্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
গণমাধ্যমেও সমানভাবে সক্রিয় ড. মুশতাক। ২০২১ সাল থেকে তিনি চ্যানেল ২৪-এর জনপ্রিয় স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘সুরক্ষায় প্রতিদিন’-এর নিয়মিত উপস্থাপক। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০০-এর বেশি পর্ব উপস্থাপনা করেছেন তিনি। ফলে স্বাস্থ্যবিষয়ক জনসচেতনতা তৈরিতেও তার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি লেখালেখিতেও রয়েছে তার সমান দক্ষতা। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিষয়ে তার একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে-‘জিন প্রকৌশল ও মানব ক্লোনিং’, ‘জিন প্রকৌশল ও জিএম শস্য’, ‘জিন মন ভালোবাসা’, ‘ক্লোনিং কেলেঙ্কারি ও আপনার কথা’ এবং ‘স্বপ্ন ও স্মৃতির অক্সফোর্ড’। এছাড়া তার একটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে।
সম্প্রতি দীপ্তি চৌধুরীর সঙ্গে তার বিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে আলোচনার আড়ালে যে মানুষটির দীর্ঘ গবেষণা, আন্তর্জাতিক অর্জন, শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড রয়েছে, সেই ড. মুশতাক ইবনে আয়ূব আজ বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি হিসেবেই বেশি পরিচিত।
//ডিবিটেক/ আইএইচ/ ইকে//





