বাজেট ২০২৬-২৭: স্বাস্থ্য খাতে চ্যালেঞ্জিং প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন কঠীন

বাজেট ২০২৬-২৭: স্বাস্থ্য খাতে চ্যালেঞ্জিং প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন কঠীন
১৩ জুন, ২০২৬ ০৯:৪৩  
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে জর্জরিত। চিকিৎসা অবকাঠামো, জনবল সংকট, সেবার মান এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হন। বিভিন্ন গবেষণা ও খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণে বাংলাদেশিদের বার্ষিক ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করা এখন শুধু সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।
 
এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ, জনবল নিয়োগ এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনা- সব মিলিয়ে বাজেটটি উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হচ্ছে। তবে বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
 
১. স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড বরাদ্দ
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমপরিমাণ। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির প্রায় ০.৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় এখনও তুলনামূলকভাবে কম।
 
২. সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার রূপরেখা
বাজেট বক্তৃতায় দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
 
পাশাপাশি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রত্যেক নাগরিককে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আওতায় আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদানের পরিকল্পনাও রয়েছে। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস সংরক্ষণ, সেবা গ্রহণ সহজীকরণ এবং স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
 
৩. দুরারোগ্য রোগীদের সহায়তা দ্বিগুণ
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ক্যান্সার, কিডনি জটিলতা, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিস, জন্মগত হৃদরোগ এবং থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের এককালীন আর্থিক সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
 
বর্তমান চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় এই সহায়তা এখনও সীমিত হলেও দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের রোগীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
 
৪. হার্টের স্টেন্ট ও ডায়ালাইসিস খরচ কমানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশে হৃদরোগ ও কিডনি রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ কারণে বাজেটে হার্টের স্টেন্টের সরবরাহ পর্যায়ে আরোপিত ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
 
এছাড়া ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর অগ্রিম করও প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে কিডনি রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা হলেও কমবে।
 
৫. ওষুধ শিল্পে নতুন প্রণোদনা
দেশীয় ওষুধ শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ উৎপাদনের জন্য নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
 
একই সঙ্গে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদনে ব্যবহৃত নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া রপ্তানিমুখী ওষুধ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামালের আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
 
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে। এই সুবিধাগুলো উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
 
৬. পাঁচ হাজার চিকিৎসক ও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ
স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় সংকট জনবল ঘাটতি। এ সমস্যা মোকাবিলায় নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
 
পাশাপাশি দ্রুত ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ঋণ চালুর ঘোষণাও বাজেটের ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটা প্রস্তাবিত, কিন্তু ওভার নাইট কিছু হবে না আর এটা ৫ বছরে করবে বলেছে। রেভিনিউ আর্ন করা লাগবে তো। সেটা বলা সহজ, করা কঠিন। তবে ট্যাক্সের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, সে জালে ফেলতে পারলে ২০৩০/২০৩১ এ সম্ভব হবে।
 
৭. স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পাশাপাশি প্রয়োজন সুশাসন
বাজেটে ঘোষিত পদক্ষেপগুলো কাগজে-কলমে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মূল সমস্যা কেবল অর্থের অভাব নয়; ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, জবাবদিহিতার সংকট এবং সেবার মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতিও সমানভাবে দায়ী।
 
এখনও বহু সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট দেখা যায়। অনেক স্থানে রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকে। রোগীদের সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বাইরে থেকে করাতে হয়। দালাল চক্র, জনবল সংকট, চিকিৎসকদের পদায়ন ও বদলি সংক্রান্ত জটিলতা এবং দুর্বল প্রশাসনিক নজরদারি স্বাস্থ্যসেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে।
 
তাই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক সংবাদ। তবে জনগণ প্রকৃত সুফল পাবে তখনই, যখন বরাদ্দকৃত অর্থ সময়মতো ব্যয় হবে, প্রকল্পগুলো দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হবে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে।
 
স্বাস্থ্যসেবা জনগণের মৌলিক অধিকার। বাজেট সেই অধিকার বাস্তবায়নের একটি রূপরেখা মাত্র; এর সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ওপর। কেননা, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশ হলেও, আন্তর্জাতিকভাবে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনেক বিশেষজ্ঞ কমপক্ষে ৩-৫ শতাংশ জিডিপি ব্যয়ের সুপারিশ করেন—এই তুলনামূলক তথ্য যোগ করলে কলামটি আরও শক্তিশালী হবে। তাই প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যা বলা হয়েছে সেটা আপাতত দৃষ্টিতে ভালো হলেও তা আন্তরিকতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার উপর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে। আর এক্ষেত্রে সময়মতো সিদ্ধান্ত ও অর্থ বরাদ্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা বলা হয়েছে সেটা রাতারাতি বাস্তবায়ন সম্ভব না।
সাধারণ ভাবে বলা হয়, স্বাস্থ্যের স্বাস্থ্য ভালো না, এটা দিয়েই অনেক কিছু বোঝা যায়। আমাদের যেমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে, তেমনি মানসিকতাও উদার না। আর স্বাস্থ্যখাত একটি জটিল সমীকরণ দ্বারা সীমাবদ্ধ। যেখানে একজন ডাক্তারের বদলির আদেশ বাস্তবায়ন করা কঠিন (ডাক্তাররা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নামে বিভক্ত), যেখানে সরকারি হাসপাতাল গুলো দালাল চক্রের হাতে জিম্মি, যেখানে অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে প্যারাসিটামল ছাড়া ঔষধ পাওয়া যায় না, একটি সাধারণ টেস্টও বাইরে থেকে করাতে হয়, যেখানে পরীক্ষার যন্ত্রপাতি অকেজো করে রাখা হয়, সরকারি এম্বুলেন্স গুলা চলে না, সেখানে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস শুনতে ভালো, বাস্তবে কঠিন। জুলাই ২৪ পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের এখন এই কঠিন কাজটি করার সময় এসেছে, কেননা জনগণ তার ন্যায্য অধিকার পেতে চায়।
আমি মনে করি সার্বিক ভাবে প্রস্তাবিত বাজেট ভালো হয়েছে। তবে অর্থ যোগান ও বাস্তবায়ন দুটোই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং। আর ধার করে ঘী তো আমরা অনেক দিন থেকেই খাচ্ছি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
লেখকঃ বিশ্লেষক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিএসইআর
দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।