সিলিকন রিভার রোডশো ২০২৬: 

বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস ও রূপান্তরের নতুন দিগন্ত

BSIA সিলিকন রিভার ইউএসএ রোডশো ২০২৬-এর অভিজ্ঞতা থেকে সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা, তরুণদের করণীয় এবং একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গঠনের রূপরেখা নিয়ে ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইনের বিশেষ বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস ও রূপান্তরের নতুন দিগন্ত
১৭ জুন, ২০২৬ ০৭:৩৫  

দুই সপ্তাহ আগে আমরা শুরু করেছিলাম BSIA Silicon River USA Roadshow 2026। আজ যখন এই যাত্রার দিকে ফিরে তাকাই, তখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো একটি বৈঠক, কোনো একটি কোম্পানি, কোনো একটি ছবি বা কোনো একটি চুক্তি নয়। আলহামদুলিল্লাহ, সবচেয়ে বড় অর্জন হলো একটি গভীর উপলব্ধি: ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ পারবে, যদি বাংলাদেশ নিজেকে বিশ্বাস করতে শেখে।

অস্টিন, ফিনিক্স, ফলসম, সিলিকন ভ্যালি এবং ওরেগনে আমরা বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা AMD, NXP, TEL, Purdue University, Arizona State University, Cactus Materials, GlobalFoundries, UC Berkeley, SanDisk, Synopsys, Credo, ARM, Intel, YES এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছি। হাজার হাজার বছরের সম্মিলিত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষদের মধ্যে আমি একটি বিষয় বারবার দেখেছি: পৃথিবী কারও জন্য অপেক্ষা করে না। যারা স্বপ্ন দেখে, পরিকল্পনা করে এবং কাজ করে—ইনশাআল্লাহ তারাই ইতিহাস লেখে।

অনেকে প্রশ্ন করেন, “বাংলাদেশ ছোট। আমরা কীভাবে পারব?” আমি বলি, তাইওয়ানের দিকে তাকান। একটি ছোট দ্বীপ, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সীমিত জনসংখ্যা। কিন্তু একটি সাহসী ধারণা, একটি স্পষ্ট কৌশল এবং কয়েক দশকের ধারাবাহিকতা তাদেরকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি শক্তিতে পরিণত করেছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো কখনো বড় ভূখণ্ড দিয়ে শুরু হয়নি; শুরু হয়েছে বড় চিন্তা দিয়ে।

অনেকে বলেন, “বাংলাদেশ তো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। কেন এখানে কেউ বিনিয়োগ করবে?” আমি এটিকে উল্টোভাবে দেখি। যদি সবকিছুই নিখুঁত হতো, তাহলে রূপান্তরের মূল্য কোথায়? আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সফল রূপান্তর শুধু বাংলাদেশের গল্প হয়ে থাকবে না। এটি হবে পৃথিবীর কোটি কোটি তরুণের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প, যারা প্রমাণ খুঁজছে যে—প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব।

অনেকে প্রশ্ন করেন, “কেন আপনি?” আমার উত্তর খুবই সহজ। আমি কোনো অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি নই। তবে আমি বিশ্বাস করি তিনটি গুণের একসঙ্গে থাকা বিরল: সততা, সক্ষমতা এবং নিরলস পরিশ্রম। এই তিনটির সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফলাফল তৈরি করে।

অনেকে বলেন, “কেন এখন?” আমার উত্তর, “এটি আরও আগে হওয়া উচিত ছিল।” কিন্তু ইতিহাসে অনেক মহান যাত্রা দেরিতে শুরু হয়েছে। দেরি হওয়া মানেই ব্যর্থতা নয়, বরং শুরু না করাই আসল ব্যর্থতা।

অনেকে বলেন, “অন্যরা কোথায়?” আমার উত্তর, “আমাদের দরজা সবার জন্য খোলা।” এই যাত্রা কোনো ব্যক্তি, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কোনো গোষ্ঠীর একার নয়। যে আসতে চায়, তার জন্য জায়গা আছে। কিন্তু কাউকে জোর করে টেনে আনা যায় না, স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়া যায় না। অংশগ্রহণ স্বেচ্ছায় হলেই তা অর্থবহ হয়।

অনেকে বলেন, “বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে কেন আসবে?” কারণ প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব কৌশল, নিজস্ব লক্ষ্য এবং নিজস্ব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকে। বাংলাদেশের কাজ হলো তাদের প্রয়োজন বুঝে এমন একটি 'ভ্যালু প্রপোজিশন' বা মূল্য সংযোজনের প্রস্তাব দেওয়া, যা তাদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রতিযোগিতা শুধু খরচে হয় না, প্রতিযোগিতা হয় দৃষ্টিভঙ্গিতে। শুধু টাকা ছড়ালেই বড় প্রতিষ্ঠান আসবে না; কারণ যে কেবল টাকার গন্ধে আসে সে দুর্বল এবং বাজারে তার কোম্পানির প্রভাব কমে গেছে। তেমন হলে তো সৌদি আরবেই পুরো সিলিকন ভ্যালি স্থানান্তরিত হয়ে যেত।

অনেকে বলেন, “বাংলাদেশ কি বিনিয়োগবান্ধব?” আমার উত্তর, আমরা সেটি হতে পারি এবং আমাদের হতেই হবে। এর জন্য নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সততা নিশ্চিত করতে হবে। একটি উদ্ভাবনী জাতি হতে চাইলে এই তিনটির কোনো বিকল্প নেই।

এখানে সরকারের ভূমিকা কী? সরকারের কাজ ব্যবসা চালানো নয়। সরকারের কাজ হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সততা প্রতিষ্ঠা করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। বাকিটা দেশের সৃজনশীল জনগোষ্ঠীই সম্পন্ন করবে। সরকার মানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দল ও ব্যক্তিবর্গ—অর্থাৎ সবাই। তাদেরকে দেশের উন্নয়নে পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে এবং অযোগ্য, চাটুকার ও দুর্নীতিবাজদের (phony crony) বাদ দিতে হবে।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আমার আহ্বান: মৌলিক জ্ঞানকে শক্তিশালী করুন। নতুন দক্ষতা অর্জন করুন। “কেন” এবং “কেন নয়” প্রশ্ন করতে শিখুন। কল্পনার পরিধি বাড়ান। সমস্যার অংশ না হয়ে, সমাধানের অংশ হতে শিখুন—উদ্ভাবক হন। দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা গ্রহণ করতে শিখুন। সততা বজায় রাখুন। আত্মবিশ্বাসী হন, তবে বিনয়ী থাকুন। ব্যক্তি বা দলের অন্ধ আনুগত্যের জন্য নয়, নীতির জন্য লড়ুন। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই নৌকার যাত্রী।

আর সংশয়বাদীদের জন্য একটি ছোট কথা: যদি কোনো উদ্যোগে আপনার সময়, শ্রম, অর্থ বা বিশ্বাসের বিনিয়োগ না থাকে, তবে সেটিকে ধ্বংস করার চেষ্টা না করে আপনার নিজের স্বপ্নের পেছনে সময় দিন। পৃথিবীতে আলো বাড়ানোর সবচেয়ে ভালো উপায় অন্যের প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া নয়, বরং নিজের প্রদীপটি জ্বালানো।

এই রোডশো আমাকে আরেকটি বড় শিক্ষা দিয়েছে—সেতু নির্মাণ করা কঠিন, কিন্তু দেয়াল নির্মাণ করা সহজ। আমরা সেতু নির্মাণের কঠিন পথটিই বেছে নিয়েছি।

সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা, যারা এই যাত্রায় পাশে ছিলেন—বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, প্রবাসী সম্প্রদায়, BSIA সদস্যবৃন্দ, BRAINGAIN নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা এবং অসংখ্য নীরব অবদানকারী। আপনাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি ধারণা ধীরে ধীরে একটি আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে।

Silicon River কোনো গন্তব্য নয়—এটি একটি যাত্রা। এবং সেই যাত্রা এখনই শুরু হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ এবং ইনশাআল্লাহ।


ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন একজন বিশ্বখ্যাত ইলেকট্রনিক্স বিজ্ঞানী এবং যুক্তরাষ্ট্রের পারডু ইউনিভার্সিটির (Purdue University) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ও ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস, সেমাটেক (SEMATECH) এবং কাউস্ট (KAUST)-এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ও ফ্লেক্সিবল ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী অবদানের জন্য তিনি IEEE, APS ও IOP-এর ফেলো নির্বাচিত হন। তার উদ্ভাবন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে "Scientific American Top 10 World Changing Ideas" এবং এডিসন গোল্ড অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে।


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।