ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে নিয়ে ফেসবুকে শরীফুল হাসানের উদ্বেগ

ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ওপর ডিবি পুলিশের নির্যাতন ও হেনস্তার ঘটনায় দেশে আইনের শাসন নিয়ে ফেসবুক পোস্টে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্র্যাক কর্মকর্তা শরীফুল হাসান। তিনি অভিযোগ করেন, সিএনজিতে থাকায় নাঈমকে সাধারণ মানুষ ভেবে নির্যাতন করা হয়েছে, যা দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত ঘটছে। পুলিশকে ব্রিটিশ আমল থেকে রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি চলে আসছে উল্লেখ করে তিনি গত ৫৫ বছরে দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং পুলিশকে পেশাদার বাহিনী

ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে  নিয়ে ফেসবুকে শরীফুল হাসানের উদ্বেগ
১৩ জুন, ২০২৬ ১১:৩২  

জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানের ওপর ডিবি (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) পুলিশ পরিচয়ধারীদের বর্বরোচিত দুর্ব্যবহার, মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে আইনের শাসন, সুশাসন এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট শরীফুল হাসান। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক হ্যান্ডেলে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে দেশে দীর্ঘ ৫৫ বছরেও সাধারণ মানুষের আইনি নিরাপত্তা ও নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

শরীফুল হাসান তাঁর ফেসবুক পোস্টে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে লিখেছেন, “পুলিশের নির্যাতনের শিকার জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈমের মুখ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শুনছিলাম! এটি অত্যন্ত অমানবিক ও ভীষণ বেদনাদায়ক! একজন জাতীয় তারকাকে যদি এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তবে ভাবুন এদেশের সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে হরহামেশাই কী ধরনের নির্মম আচরণ করা হয়।”

ক্রিকেটার নাঈম হাসান সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সাধারণ পোশাকে বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফিরছিলেন বলেই তাকে অতি সাধারণ মানুষ মনে করে পুলিশ এই ক্ষমতার দাপট ও হয়রানি দেখিয়েছে বলে দাবি করেন শরীফুল হাসান। দেশের শ্রেণি-বৈষম্য ও আইনি প্রয়োগের দ্বিমুখী নীতি তুলে ধরে তিনি কঠোর ভাষায় লিখেছেন, “খেয়াল করলে দেখবেন এদেশে দামী ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে কাউকে নামিয়ে পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের ঘটনা সচরাচর ঘটে না। কিন্তু সিএনজি, রিকশা কিংবা লোকাল বাস থেকে নামিয়ে সাধারণ চেহারার যাকে-তাকে যখন-তখন নির্যাতন করা যায়। কারণ তারা মনে করে এদের কোনো ক্ষমতা বা উচ্চ মহলের যোগাযোগ নেই।”

ফেসবুক পোস্টে তিনি নাঈম হাসানের বর্ণিত ঘটনার ভয়াবহ দিকগুলো উল্লেখ করেন। জানা যায়, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিএনজি অটোরিকশা যোগে বাসায় ফেরার পথে ডিবি পুলিশ পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর গতিবিধি রোধ করেন। নাঈম হাসান নিজের ক্রিকেটার পরিচয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেখানোর পরও পুলিশ সদস্যরা তা আমলে না নিয়ে তাকে নির্মমভাবে মারধর করে এবং জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ চরম হেনস্তা করে। এই প্রসঙ্গে শরীফুল হাসান বলেন, “নাঈম হাসান একজন সেলিব্রেটি বা তারকা ক্রিকেটার হওয়ায় বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে এবং প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু প্রতিদিন দেশের হাজারো সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে, যার কোনো বিচার বা প্রতিকার তারা কোনোদিন পান না।”

  

এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকটকে কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে শরীফুল হাসান বলেন, “ঘটনাটিকে কেবল ‘কয়েকজন বিপথগামী পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত দায়’ হিসেবে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এদেশে সব আমলেই পুলিশ বাহিনীর চরিত্র কমবেশি এমনই ছিল। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রতিটি শাসক বা রাজনৈতিক সরকারগুলো পুলিশ বাহিনীকে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।”

দেশে টেকসই আইনের শাসনের মারাত্মক ঘাটতির বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, “স্বাধীনতার গত ৫৫ বছরে দেশের বিভিন্ন সরকারের আমলে দৃশ্যমান বড় বড় কমবেশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেক হয়েছে, রাস্তাঘাট-সেতু হয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে জরুরি ‘আইনের শাসন’ কোনো আমলেই প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। অথচ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আইনের শাসনই হলো সবচেয়ে প্রধান ও মৌলিক স্তম্ভ।”

ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার জোর আহ্বান জানিয়ে শরীফুল হাসান লিখেছেন, “একটি রাষ্ট্র ও তার সমাজকে যদি আসলেই ঠিক করতে হয়, তবে সবার আগে সেখানে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের আইন-আদালত, নির্বাহী বিভাগ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী হিসেবে গড়তে হবে। বিশেষ করে পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে একে একটি জনবান্ধব ও উচ্চ পেশাদার বাহিনী হিসেবে রূপান্তর করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।”

পোস্টের শেষাংশে তিনি দেশের নীতিনির্ধারক ও বর্তমান সরকারের প্রতি দ্রুত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ মনোযোগী ও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “একটা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই যদি সাধারণ মানুষকে নূন্যতম মানুষের মর্যাদা না দেয়; দেশের রাস্তাঘাট, থানা, পুলিশ, আদালত ও সাধারণ প্রশাসনের সর্বত্র মানুষ যদি পদে পদে চরম হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হন, সুশাসন যদি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তবে সেই দেশের সার্বিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”

গত পরশু রাতে চট্টগ্রামের রাস্তায় জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান ডিবি পুলিশের হাতে নির্মম হেনস্তা ও মারধরের শিকার হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ঝড় ওঠে। দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে অভিযুক্ত ৩ পুলিশ সদস্যকে ইতিমধ্যে ডিবি ও থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং ঘটনার তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

//ডিবিটেক/এসএইচ/ইকে//