পারমাণবিক শক্তিতে বিনিয়োগ জাতীয় উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতার বিনিয়োগ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় সরকার পারমাণবিক শক্তিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ বলে মন্তব্য করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
১২ জুন, শুক্রবার পাবনার ঈশ্বরদীতে অনুষ্ঠিত ‘নিউক্লিয়ার এনার্জি: স্ট্র্যাটেজি, রিয়েলিটিজ অ্যান্ড বাংলাদেশস পাথ ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সহযোগিতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এ আয়োজন করে।ৎ
সেমিনারে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিষয়ক পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড.এম মঈনুল ইসলাম এবং প্রধান সমন্বয়ক (এনএসপিসি) ব্রিগেডিয়ার রোবায়েত ।
মন্ত্রী বলেন, একটি সফল পারমাণবিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে শুধু অবকাঠামো বা প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা সংস্কৃতি।
তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৮ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহারে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এটি দেশের বিজ্ঞানভিত্তিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিফলন।
প্র:ধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী মাহবুব আনাম জানান, কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, পারমাণবিক প্রযুক্তির গুরুত্ব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্যসেবায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা, কৃষিতে উন্নত জাত উদ্ভাবন, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী আগস্টের শেষ দিকে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন করার লক্ষ্যও তুলে ধরেন।
বক্তব্যে মন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষায় আরও বিনিয়োগ এবং সক্ষমতা উন্নয়নের আহ্বান জানান। তার মতে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রায় এ খাত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, পারমাণবিক শক্তি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বড় পরিসরে নির্ভরযোগ্য ও কম-কার্বনযুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে। অন্যান্য অনেক জ্বালানি উৎসের মতো এটি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করে, শিল্পখাতের বিকাশ ঘটায় এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বে অবদান রাখে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, পারমাণবিক শক্তি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়, এটি বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করার বিষয়। এটি আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়, মানুষের পেছনে বিনিয়োগ করার বিষয়, আগামী প্রজন্মের জন্য সুযোগ সৃষ্টির বিষয়। এটি নিশ্চিত করা যে বাংলাদেশ যেন একটি সমৃদ্ধ, উদ্ভাবনী, স্থিতিস্থাপক এবং জ্ঞানভিত্তিক জাতি হিসেবে তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে।
তিনি বলেন, এ গোলটেবিল আলোচনা বাংলাদেশের পারমাণবিক গভর্ন্যান্স (শাসন ব্যবস্থা) এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করবে। এটি নীতি-নির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিজ্ঞানী, শিল্প উদ্যোক্তা, গণমাধ্যমকর্মী এবং উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য নিজেদের আইডিয়া বিনিময়, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি এবং আগামী দিনের পথনকশা তৈরির একটি মূল্যবান সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু তালেব মন্ডল, পাবনা-২( সুজানগর-বেড়া) আসনের সংসদ সদস্য এএডভোকেট সেলিম রেজা হাবিব, পাবনা জেলা বিএনপির আহবায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব, আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর শওকত আজিজ রাসেল প্রমুখ।
এছাড়াও ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি ( IAEA) এর নিউক্লিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট সেকশন এর, টেকনিক্যাল লিড মেহমেত সাইহান (Mehmet Ceyhan) বক্তব্য রাখেন।
সেমিনারে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড.মোঃ কবির হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক/একাডেমিয়া, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ,ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
//ডিবিটেক/এএএম/এমআই//





