বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ ইলন মাস্ক

বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ ইলন মাস্ক
১৩ জুন, ২০২৬ ০৯:৩২  

বিশ্বের শীর্ষ ধনী এবং মার্কিন প্রযুক্তি টাইকুন ইলন মাস্ক মানব ইতিহাসের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ বা লক্ষ-কোটিপতি (১,০০০,০০০,০০০,০০০ ডলারের মালিক) হওয়ার অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন। গত শুক্রবার (১২ জুন) পুঁজিবাজারে তার রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স-এর ঐতিহাসিক এবং বহুল প্রতীক্ষিত প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও চালুর পর এই অভাবনীয় রেকর্ড তৈরি হয়। আজ শনিবার ব্লুমবার্গ নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

পুঁজিবাজারে অভিষেকের ঠিক আগে স্পেসএক্স-এর প্রতিটি শেয়ারের প্রারম্ভিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৩৫ মার্কিন ডলার। সেই হিসাবে কোম্পানিটিতে থাকা ইলন মাস্কের নিজস্ব শেয়ারের মূল্যই দাঁড়ায় প্রায় ৮৬০ বিলিয়ন (৮৬,০০০ কোটি) ডলারে। এর সাথে গত শুক্রবার লেনদেন শুরু হওয়ার পর শেয়ারের দামের অভাবনীয় উত্থান (পপ) এবং তার ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘টেসলা’র শেয়ারের অংশীদারিত্ব মিলিয়ে মাস্কের অন-পেপার বা কাগজে-কলমে মোট সম্পদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে।

১. বিপুল ক্ষমতা, বিতর্ক এবং চরম সমালোচনা
ইলন মাস্কের এই ট্রিলিয়নিয়ারে রূপান্তর এমন এক সময়ে ঘটল যখন বৈশ্বিক রাজনীতি ও মার্কিন প্রশাসনে তার প্রভাব এবং তাকে নিয়ে সমালোচনা—উভয়ই সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছে।

বিগত ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় মাস্ক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন (৩০ কোটি) ডলারের বিশাল তহবিল জোগান দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের জয়ের পর তিনি সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের নীতি নির্ধারণে জড়িয়ে পড়েন এবং নবগঠিত ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’-র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভাগটি মার্কিন সরকারের সামগ্রিক খরচ কমাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট পর্যালোচনা ছাড়াই একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বাতিল করেছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘ইউএসএআইডি’সহ সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার পেছনে মাস্কের একচ্ছত্র ভূমিকার কারণে। হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাস্কের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তা বন্ধ হয়ে গেছে, যা ইতিমধ্যেই কয়েক লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

২. সম্পদের নতুন উৎস: ১ ট্রিলিয়নের টেসলা প্যাকেজ ও ট্যাক্স ফাঁকি
ইলন মাস্কের সম্পদের এই জোয়ার এখানেই থামছে না। গত বছর টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা মাস্কের জন্য একটি বিশেষ ‘পে প্যাকেজ’ অনুমোদন করেছেন, যা কোম্পানির বাজারমূল্য ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সাপেক্ষে এককভাবে আরও ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যে পৌঁছাতে পারে।

এছাড়াও, স্পেসএক্স-এর কাঠামোগত শর্ত অনুযায়ী মঙ্গল গ্রহে স্থায়ী মানব বসতি স্থাপন না করা পর্যন্ত মাস্ক তাঁর মালিকানাধীন প্রায় ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) শেয়ার সরাসরি বিক্রি করতে পারবেন না। যদিও স্পেসএক্স নিজেই স্বীকার করেছে যে এই লক্ষ্য পূরণ হওয়া "অসম্ভবপ্রায়", তবে মাস্ক চাইলে এই বিশাল পরিমাণ শেয়ার বন্ধক বা জামানত রেখে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো থেকে শত শত কোটি ডলার নগদ ঋণ বা লোন নিতে পারবেন। এই চতুর অর্থনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে তিনি কোনো ধরনের কর বা আয়কর পরিশোধ ছাড়াই বিপুল পরিমাণ তরল ক্যাশ বা নগদ অর্থ ব্যবহারের সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন।

৩. স্পেসএক্সে একনায়কতন্ত্র: সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষমতাহীন
স্পেসএক্স এখন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য উন্মুক্ত হলেও, প্রতিষ্ঠানটির ওপর মাস্কের একক নিয়ন্ত্রণ বিন্দুমাত্র কমছে না। কারণ, কোম্পানির ৮০ শতাংশের বেশি ভোটিং পাওয়ার বা ভোটাধিকার এককভাবে মাস্কের হাতেই থাকছে।

এর ফলে তিনি নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা পর্ষদ বাছাই করতে পারবেন এবং কোম্পানির আইনি কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে কোনো সাধারণ বিনিয়োগকারী বা আদালত চাইলেও মাস্কের কোনো বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তকে আইনি চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে না। মহাকাশ গবেষণা ও স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মতো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং লাভজনক বাজারের একচ্ছত্র সম্রাট হিসেবে ইলন মাস্ক এখন কেবল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিই নন, বরং আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর কর্পোরেট নেতায় পরিণত হলেন।

ডিবিটেক/বিএমটি    ।    সূত্র: টেকক্রাঞ্চ